Alapon

আমি যে কারণে টার্কিশ ফরেন পলিসি পছন্দ করি...



আমার একটা পছন্দের ফরেন পলিসি হল টার্কিশ ফরেন পলিসি। কিছু কিছু দেশ আছে যাদের ভূগোলই ঠিক করে দেয় সে দেশটার ফরেন পলিসি কেমন হবে। মিশর, তুরস্ক, সৌদি আরব, আফ গানিস্তান, ক্ষেত্রবিশেষে বাংলাদেশ, মায়ানমার ও সুইজারল্যান্ড- এসব দেশের অবস্থান এমন এমন জায়গায় যে এরা যদি স্বতন্ত্র পরিচয়ে নিজের দাবি না জানায় তাহলে বাইরের দেশ এদেরকে নিয়ে মাথা ঘামাবেই। কাজেই ভৌগোলিক কারণে ইতিহাসের লম্বা সময় ধরে এদের ফরেন পলিসি হয় হতে হবে হার্ড ব্যালেন্সিং ধরনের, নাহলে এরা অন্য বড় দেশের প্লেয়িং গ্রাউন্ড হিসেবে ভুগবে।

শুধুমাত্র "টার্কিশ" বলে তার ফরেন পলিসি পছন্দ এ কারণে আমি লেখাটা লিখছি না। দুইটা কারণে এই লেখাটা লিখছি।

এক- এরকম ফরেন পলিসির একটা ভালো ডায়নামিক এস্পেক্ট আছে, একটা গতিশীলতা আছে, যেটা বুঝলে একাডেমিকভাবে ও পলিসি লেভেলে কিছুটা কাজে আসে।

তেল, গ্যাসের মত আধুনিক অর্থনীতির সম্পদের প্রাণ না হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র লিডারশিপ ও ভূ-রাজনীতির সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে টার্কিশ ফরেন পলিসি একটা সময় একই সাথে অনেকগুলো ফ্রন্টে জড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যেখানে প্রায় প্রতিটা ফ্রন্টে আমেরিকা বা রাশিয়ার উপস্থিতি আছে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো যুদ্ধে গড়িয়েছে। সিরিয়া যুদ্ধের পর লিবিয়া যুদ্ধে জড়ানো, আর্মেনিয়ার বিপক্ষে আজারবাইজানের জয় ছিনিয়ে আনা, সৌদি-আমিরাতের কাতার ব্লকেডে কাতারে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা, এবং আফ্রিকার সোমালিয়া, মালি ও সেনেগালে হস্তক্ষেপ করা। এসব ছাড়াও স্নায়ু যুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে মধ্য এশিয়ার "স্তান" রাষ্ট্রগুলো তৈরি হলে তাদের সাথে বাণিজ্য ও বলকান অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার- মোটামুটি বলা যায় তার ফরেন পলিসি আশেপাশের সব অঞ্চলে নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে গেছে।

তবে এত ব্যালেন্সিং সত্ত্বেও বাঙালি মুসলিম মন টার্কিশ লিডারশিপের কাছে দূর থেকে বিভিন্ন রকম দাবি করে বসে। তার একটা হল ইসরায়েলকে উড়িয়ে দিয়ে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করা। তুর্কিতে স্বর্ণমুদ্রা চালু করা এবং আরো কি কি যেন কম হোক বা বেশি এগুলো তুর্কির দ্বারা সম্ভব না, আর এরদোয়ান কোনো অটোম্যান খলিফা না যে তার পক্ষে ইসলামের বেসিক কাঠামো ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এই ফরেন পলিসির ওয়েট কেবল সৌদি আরবের বা আরব উপদ্বীপের সম্মিলিত শক্তির কাছে আছে।

ইউক্রেন যুদ্ধে আমরা দেখি টার্কিশ ফরেন পলিসি "রাজনৈতিকভাবে" ইউক্রেনকে সাপোর্ট করছে, ইউক্রেনের কাছে বায়রাক্তার ড্রোন সাপ্লাই দিয়েছে। আবার অন্যদিকে "অর্থনৈতিকভাবে" গ্যাস পাইপলাইন ও বাণিজ্যে রাশিয়াকে সাহায্য করছে। এর বিপরীতে দুটো দেশের কাছ থেকে তুর্কি একটা শস্য চুক্তি বের করে নিয়ে এসেছে।

আমার মনে হয় না এর বাইরে কোনোভাবে সহজ সরলভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি চলে। আসলে অনেকে জানেই না কূটনীতি, ডিপ্লোমেসি কি।

দ্বিতীয় যে কারণে এটা লিখেছি সেটা হল, IR এর একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ডের অনেকেই জানেন না আমেরিকার বাইরে কোনো ফরেন পলিসি আছে।

আমাদের সময়ে ছাত্র ছাত্রীদের পক্ষ থেকে যখন এসাইনমেন্ট, রিসার্চ, প্রেজেন্টেশনের টাইটেলগুলো আসত, এমনকি টিচাররাও উৎসাহ দিতেন, সেগুলোর বেশিরভাগের মানে ছিল এরকম-
আমেরিকা ইরানকে কিভাবে আটকাবে?
আমেরিকা রাশিয়াকে কিভাবে দেখে নেবে?
আমেরিকা উত্তর কোরিয়াকে কিভাবে সামলাবে?

ব্যাপারটা এমন যে ইউনিভার্সিটি শিক্ষাব্যবস্থা একটা প্রজেক্ট, যেখানে আমেরিকান একাডেমিরা ডলার সাপ্লাই ও লিটারেচার সাপ্লাইয়ের বিনিময়ে আমাদের চিন্তা ভাবনা কিনে নিচ্ছে। আমার এই কথাটা ভুল মনে হলে প্রমাণ করুন সত্যটা কি। ইউনিভার্সিটি শিক্ষাব্যবস্থা হেভিলি বায়াসড ও কলোনাইজড একটা ব্যবস্থা। যতদিন না আমরা নিজেদের পরিচয় জানবো ও স্পষ্টভাবে জানান দিতে পারবো ততদিন এই শিক্ষাব্যবস্থা সিন্দাবাদের ভূতের মত আরো বেশি করে আমাদের উপর চাপতে থাকবে। এই রকম প্রেজেন্টেশন, এসাইনমেন্ট যে এখনো আসছে না, তা না। এটা আসতেই থাকবে, যতদিন না আইআর ও অন্যান্য স্টুডেন্টরা নিজেদের সভ্যতাকে নিয়ে জানবে।

আমি এমন মানুষদেরকে জানতাম যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাবলি সাল ক্যালেন্ডার ধরে বলে দিতে পারে। অস্ট্রো- হাঙ্গেরি, সার্বিয়া, ফ্রান্স- ইংল্যান্ডের ফরেন পলিসির ইতিহাসের অলিগলি তাদের জানা। তবে অবাক করা বিষয় হল তাদের অনেকেই জানে না কুখ্যাত ব্রিটিশ গোয়েন্দা লরেন্স অব অ্যারেবিয়া ওরফে থমাস এডওয়ার্ড লরেন্স একাই সে সময়ে পুরো মুসলিম উম্মতের কি ক্ষতিটা করে গেছে, কিংবা শরিফ হুসেইন ও আল সউদের পরিবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ও পরে কিভাবে তেরশত বছরের একটা ইতিহাসের সাথে বেঈমানি করে গেছে।
********************
ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদেরকে প্রমাণ করে দিয়েছে আমেরিকার মিডিয়া ও একাডেমিক রিসার্চাররা যেভাবে বর্তমান পৃথিবীকে গ্লোবালাইজড পৃথিবী বলে থাকে, সেই পৃথিবী এখনো পরিপূর্ণভাবে গ্লোবালাইজড না। এখানে রাশিয়া তার পুরো রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে ওয়েস্টার্ন এম্পায়ারের বিরুদ্ধে নেমে পড়েছে। ওয়েস্টের গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে পুতিন রাশিয়াকে ঠেকিয়েছে রাশিয়াকে একটা বদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে তৈরি করে। ম্যাকডোনাল্ডস, সিটি ব্যাংক, ভিসা মাস্টারকার্ডের মত প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাশিয়া ছেড়ে চলে যাচ্ছে তখন এটা শর্ট টার্মে রাশিয়ার জন্যে ক্ষতি হলেও লং টার্মে পুতিনের জন্য লাভ হয়েছে।

চীনও এভাবে চিন্তা করে। একটা বদ্ধ রাষ্ট্রের পরিচয় নিয়ে। কিন্তু একটা মুসলিম দেশের ফিলোসফিতে এটা নেই। ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে মুসলিম সালতানাতগুলো বিস্তৃত হতে চেয়েছে এবং হয়ে এসেছে। দু'শ বছর হল কলোনিয়ালিজম কেবল এই ব্যাপারটাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তুর্কির এরদোয়ান তাই পুরো রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে ওয়েস্টের বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে পারে না। মুসলিম বিশ্ব আগে থেকেই গ্লোবালাইজড। পার্থক্য হল বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে ইসলামিক থট ও ওয়েস্টার্ন থট দুইভাবে মিলে মিশে একটা নতুন মডেল দাঁড়িয়েছে। এটাকে আপনি ইসলামের দুর্বলতা বলতে পারেন, আবার শক্তিও বলতে পারেন।

আর পুতিনের সাথে তার তফাত এখানে, তার ফরেন পলিসির পিছনে অন্য জায়ান্টদের ফরেন পলিসির ইতিহাস আছে। পুতিনের ফরেন পলিসির উপাদান আসে জারদের থেকে, ইভান দ্য টেরিবল, পিটার দ্য গ্রেট, ক্যাথরিন দ্য গ্রেট- যারা রাশিয়ার জন্য স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী রাজ্য চেয়েছিল। সেভাবেই পুতিনের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ঐতিহাসিক উপাদান আছে। টার্কিশ ফরেন পলিসির উপাদানে আছে ঐতিহাসিকভাবে দারুল হারবের সাথে দারুল ইসলামের দ্বন্দ্ব। কিন্তু সমস্যা হল বর্তমান পৃথিবী পুরোটাই দারুল হারব দিয়ে তৈরি। এখানে কোনো দারুল ইসলাম নেই।

তুর্কিসহ বেশিরভাগ মুসলিম দেশ ওয়েস্টার্ন ইনফ্লুয়েন্সে গ্লোবালাইজড এবং তাদের সমাজব্যবস্থা দারুল হারব ও দারুল ইসলামের দ্বন্দ্ব নিয়ে পরিচয় সংকটে ভুগে। বর্তমানে কোনো মুসলিম দেশেই আপনি পরিপূর্ণ ইসলামকে পাবেন না। একেক দেশে ইসলামের একেক খণ্ডিত অংশ পাবেন। প্রাচ্যে আপনি ঘুমন্ত অবস্থায় পাবেন ইসলামের রুহানী সত্তাকে; কিন্তু তার দেহটাকে লাশ হিসেবে পাবেন পাশ্চাত্যে। এভাবে ইসলাম খণ্ড বিখণ্ড হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। একজন পরবর্তী যুগের লিডারের অপেক্ষায় আছি যিনি এই দেহ আর আত্মাকে এক জায়গায় এনে একটা ইনসানিয়াতের সভ্যতা উপহার দিতে পারবেন।

@Mohammad Abu Saim

পঠিত : ৬৩ বার

ads

মন্তব্য: ০