Alapon

জান্নাত পাওয়া যাবে শুধুমাত্র ঈমান দ্বারা, কিন্তু সেই ঈমান হতে হবে ভেজালমুক্ত...



একজন ইহুদির ছেলে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর খেদমতে ওজুর পানি এনে দিত। প্রিয়নবী (সা.) এর জুতাগুলো সামনে এনে দিত। কাউকে কোনো কিছু দিতে হলে অথবা কোনো কিছু আনতে হলে- এই ছেলেটি দৌঁড়ে যেত এবং রাসুল (সা.) এর কাজটা করে দিত।
একদিন ছেলেটি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। কয়েকদিন রাসুল (সা.) এর খেদমতে আসতে পারেনি।

আল্লাহর রাসুল (সা.) লক্ষ করলেন, যে ছেলেটি সকাল-বিকেল তার সেবায় উপস্থিত থাকত, কয়েকদিন ধরে তাকে দেখা যাচ্ছে না। তিনি দ্রুত ছেলেটি সম্পর্কে সাহাবীদের কাছে খোঁজ-খবর নিলেন।

একদিন নবীজি মসজিদ-ই-নববীতে বসে আছেন। একজন সাহাবী হন্তদন্ত হয়ে মসজিদে প্রবেশ করল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা নিয়ে এসেছে।
হে আল্লাহর রাসুল! সেই ইহুদির ছেলের সন্ধান পেয়েছি। বেশ কিছুদিন ধরে সে খুব অসুস্থ।
জবাবে নবীজি কিছুই বললেন না।

পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ততম মানুষটি যখন জানতে পারলেন ছোট্ট ছেলেটি অসুস্থ,
তত্ক্ষণাৎ উঠে মসজিদ থেকে বেরিয়ে ইহুদিপল্লীতে বালকের বাড়ির পথ ধরলেন। উপস্থিত সাহাবিরাও কিছু না বুঝেই নবীজির পিছু পিছু ছুটলেন। যেন তাঁর আপন কেউ অসুস্থ।
তখন তিনি তাকে দেখার জন্য তার ঘরে আগমন করেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) যখন ওই ইহুদি ছেলেটির ঘরে পৌঁছলেন, তখন ছেলেটির পিতাও ঘরে উপস্থিত ছিল।

ছেলেটির কী সৌভাগ্য! আল্লাহর রাসুল (সা.) তাকে দেখার জন্য তার ঘরে আগমন করেছেন!! সে তখন খাটে শায়িত ছিল। রাসুল (সা.) তার শিয়রে বসে। কেমন লাগছে তার জিজ্ঞাসা করলেন। পরিশেষে বুঝতে পারলেন, ছেলেটি এখন জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পার করছে। নবিজী পেরেশান যে উনার সামনে একজন কাফের অবস্থায় মারা যেয়ে জাহান্নামে যাচ্ছে তিনি সহ্য করতে পারতেছেন না!

প্রিয় পাঠক! অন্যের প্রতি রাসুল (সা.) এর ভালোবাসা, মানুষের প্রতি অভাবনীয় কল্যাণকামিতার প্রতি লক্ষ্য করুন। তিনি যখন দেখলেন, ছেলেটি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে তখন চিন্তা ফিকির করলেন, জাহান্নামের আজাব থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন। সুতরাং তার জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়ার পূর্বেই আল্লাহর রাসুল (সা.) ছেলেটিকে সম্বোধন করে বললেন, “হে ছেলে! ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলো। ”

ছেলেটি এ কথা শোনে চোখের পাতা খুলে রাসুল (সা.) এর আলোকময় নূরানী চেহারার দিকে তাকালো। তারপর ছেলেটি পার্শ্ব পরিবর্তন করল। নিজ চেহারাটা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পিতার দিকে ফেরলো। ছোট ছেলে, বাচ্চা মানুষ। তাই হয়ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না।
প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে পিতার দিকে তাকিয়ে অনুমতি চাচ্ছিল। ছেলেটির বাবা রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি ঈমান আনেনি ঠিক। কিন্তু সে জানত, মুহাম্মদ (সা.) সত্য নবী। তাই সন্তানকে বলল, ‘প্রিয় ছেলে! তুমি আবুল কাসেমের কথা মেনে নাও। ’ (অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা.) যা বলছেন, তার উপর আমল করো। আর আবুল কাসেম প্রিয়নবীর উপনাম ছিল। )

তার পিতা অনুমতি দেওয়ামাত্রই ছেলেটি পড়তে শুরু করলো- ‘আশহাদু আল-লা ইলাহা, ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। ’ অর্থাৎ ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই এবং আপনি আল্লাহর রাসুল।

এদিকে তার মুখ থেকে এসব বাক্য বের হয়েছে, আর ওদিকে তার জীবনের অবশিষ্ট মুহূর্তগুলোও দ্রুত ফুরিয়ে গেল। সে শেষ কয়েকটি নিঃশ্বাস নিল। অতঃপর নশ্বর পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে নিল।

ছেলেটির মৃত্যুর পর আল্লাহর রাসুল (সা.) তার ঘর থেকে সন্তুষ্টচিত্তে বেরিয়ে এলেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। সাহাবায়ে কেরামকে বলেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের নামাযে জানাযা পড়ো। ’ কারণ সে মুসলমান। সেই ছেলেটির প্রতি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে বললেন, ‘সেই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, যিনি আমার মাধ্যমে তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করেছেন। ’

চিন্তা করার বিষয় যে, ইহুদির ছেলেটি ছোট ছিল! কোনো ধনী ব্যক্তির ছেলে ছিল না। কোনো গোত্রের সর্দার এর ছেলেও ছিল না। রাসুল (সা.) বিশ্ববাসী ও পুরো মানবতাকে শিক্ষা দিতে চাচ্ছিলেন যে, ইসলামে নৈতিকতা কাকে বলা হয়। একজন ছোট মানুষও যদি অসুস্থ হয়, তাকে দেখতে যাওয়া কর্তব্য।

আরেকটি ব্যাপার বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় যে, ছেলেটি জীবনে ১ ওয়্যাক্ত নামাজ ও পড়েনি, কোনোদিন রোজা ও রাখেনি! তো সে জান্নাতে কিভাবে গেলো!! শুধুমাত্র ঈমানের কারনে!!!
ঈমান কি?" তুমি ঈমানদার হবে তখন , যখন তোমার ভালো কাজ তোমাকে আনন্দ দেবে,, আর মন্দ কাজ দেবে মনোকষ্ট!"

~ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ {সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম}

সত্যিকার অর্থেই, জান্নাত পাওয়া যাবে শুধুমাত্র ঈমান দ্বারা, কিন্তু সেই ঈমান হতে হবে ভেজালমুক্ত! জান্নাত কিনার কারেন্সি বা মুদ্রা হলো ঈমান! জাল হাজার টাকার নোট দিয়ে যেমন কোনো জিনিস কেনা যায় না, তদ্রুপ জাল ঈমান দিয়েও জান্নাত কিনা যায় না! ঈমানের ভেজাল কি?

সেটা হলো: ' আল্লাহ তো আমাকে পালেন ই কিন্তু চাকরি না করলে কেমনে পালবেন, ক্ষেত খামার, ব্যবসা বা টাকা ইনকাম না করলে কেমনে পালবেন!!'

এই ' কিন্তু, কেমনে ' হলো ঈমানের ভেজাল বা সূক্ষ্ম শিরক!! এই ভেজাল দূর করার জন্য ঈমানের পেছনে মেহনত করতে হবে! মেহনত ছাড়া দুনিয়াতে কিছু হয় না! সব জিনিস এ মেহনত করি কিন্তু এই সবচে দামী যে ঈমান এর পিছনে মেহনত করবো না!
সাহাবীরা ঈমানের জন্য মেহনত করে দামী হয়েছেন!

এই ঈমানের মেহনত নাম হচ্ছে দাওয়াত! যতো বেশি আমি মানুষকে আল্লাহর বড়ত্বের কথা বলবো, নামাজের বা নেক আমলের দাওয়াত দিব আমার ঈমান ভেজালমুক্ত হয়ে দামী হতে থাকবে!

আর আমল দ্বারা জান্নাতের নেয়ামত পাওয়া যাবে! দাওয়াত এর মেহনত করলে আগে নিজের ফায়দা হবে, ঠোঁটের ঈমান অন্তরে প্রবেশ করবে!

লোহা পানিতে ডুবে যায়! কিন্তু লোহার উপর মেহনত করতে তা পানিতে ভাসে (জাহাজ!) লোহার উপর আরো মেহনত করলে তা আসমানে উড়ে (এরোপ্লেন!) ঠিক তদ্রুপ ঈমানের পিছনে মেহনত করলেও ঈমানের মূল্য বাড়বে! ঈমান বাড়লে আমল করা সহজ হবে, তখন দুই হাত আসমানে উঠাতে দেরি কিন্তু দুআ কবুল হতে দেরি হবে না!?
(বুখারি শরিফের ১৩৫৬ নম্বর হাদিস অবলম্বনে)
সূরা মুদ্দাসির এ এই দাওয়াত এর মেহনত এর কথাই বলা হয়েছে,
يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ
হে চাদরাবৃত!
قُمْ فَأَنذِرْ
উঠুন, সতর্ক করুন,,
وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ
(মানুষকে) আপনার পালনেওয়ালার বড়ত্বের দাওয়াত দিন।

আল্লাহ তা'য়ালা আমাদের সবাইকে জামাতের সাথে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার এবং আলেমদের সোহবতের সংস্পর্শে দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ এবং মসজিদের পরিবেশে থেকে ঈমান ও আমলের মেহনত করার তাওফীক দান করুন...আমিন।
আল্লাহ হাফেজ।

পঠিত : ২০৬ বার

মন্তব্য: ০