Alapon

মাদখালীদের বিদআত বিদআত খেলা




মাদখালীরা অনেক কিউট। নিজেদের মতানুযায়ী যাকে খুশি তাকেই তারা বিদআতী, আহলুল হাওয়া (কুপ্রবৃত্তির অনুসারী), সাহিবুল বিদআত (বিদআতী) বলে ঘোষণা দিতে পারে। সাইয়্যেদ কুতুব খারাপ কেননা সে তাগূতের (তাদের ভাষার শাসকের) বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, মওদূদী প্রচণ্ড খারাপ কেননা তিনি অমুক অমুক কাজ করেছেন, দেওবন্দীরা খারাপ, তাদের আকাবীররা সব ভুয়া অথবা কেবল তালিবে ইলম, বেরেলবীরা তো সিলেবাস থেকেই খারিজ, ইখওয়ান খারাপ, ইউসুফ এস্টেস খারাপ, বিলাল ফিলিপস খারাপ, সালিহ আল-মুনাজ্জিদ খারাপ, ইখওয়ানের প্রশংসা যে করে সে খারাপ, আল-কায়েদা যে করে বা তাদের প্রশংসা করে সে খারাপ, তালেবান যে করে বা তাদের প্রশংসা করে ওরাও খারাপ। যে তাদের মত না, তারা সবাই-ই খারাপ। যে-ই তাদের ঘোষণাকৃত ব্যক্তিদের সাথে উঠবে, বসবে, মেলামেশা করবে তারা সকলেই খারাপ। যারা নিজেদের মানহায লুকায় তারা খুব খারাপ। কেননা সালাফরা বিদআতের বিষয়ে অনেক কঠোর ছিলেন, তারা বিদআতীদের সাথে চলাফেরা করতে কিংবা তাদের সাথে উঠাবসা করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং যারা এমনটা করবে তারা সবাই বিদআতী অথবা বিদআতের সাহায্যকারী, হিযবী আরও কত কি……… আসলেই কি সালাফরা এমনটাই করেছিলেন? তাদের মত এভাবেই বিদআতের ফনা সালাফরাও তুলেছিলেন?
.
না, সালাফরা তাদের মত এমন সংকীর্ণ মনোভাবের অধিকারী ছিলেন না। সালাফদের সময়ে তারা যেসব বিদআতের বিরোধীতা করেছিলেন, তারা যেসব বিদআতীদের সাথে উঠাবসা করতে নিষেধ করেছিলেন, তারা যাদেরকে কুপ্রবৃত্তির কারণে আহলুল হাওয়া বলেছিলেন, তাদের সালাম দিতে পর্যন্তও নিষেধ করেছিলেন- তারা সবাই-ই ছিলো এমন বিদআতের দিকে আহ্বানকারী ও অনুসরণকারী যা কুফর ছিলো, অর্থাৎ, বিদআতে মুকাফফারাহ অথবা বিদআতে কুবরা, যে বিদআত কুফর অথবা বড় কুফর। যেমন, ইবনু তাইমিয়্যাহ লিখছেন,
.
“এ পথ অথবা এমন কিছুই হলো আহলুল বিদআতের পথ। যারা অজ্ঞতা ও যুলমের মাঝে অবস্থান করে। অতঃপর তারা কিতাব, সুন্নাহ ও সাহাবাদের ইজমার বিপরীতে বিদআত উদ্ভাবন করে এবং যারা তাদের বিদআতের বিরোধীতা করে তাদের কাফির সাব্যস্ত করে, যেমনঃ খারেজী, যারা তাদের ধারণা মোতাবেক কুরআনের বিপরীত সুন্নাতের ওপর আমল পরিত্যাগ করে এবং কবীরাহ গুনাহের জন্য তাকফীর করার বিদআত উদ্ভাবন করে, সাথে সাথে যারা তাদের বিরোধীতা করে তাদের তাকফীর করে.........” (আল-ইস্তিগাছা, পৃঃ ২৪৯)

.
এরপর তিনি বিভিন্ন ফিরকার বিভিন্ন বিদআতের বর্ণনা দেন, যেসকল বিদআতী আকীদাহ তারা উদ্ভাবন করে নিয়েছে দ্বীনের নাম করে। এসকল বিদআতীরা ছিলো মূর্খতার শিকার, যুলমের প্রান্তে অবস্থানকারী ও ভারসাম্যহীন। অপরদিকে আহলুস সুন্নাহ হলো ভারসাম্যপূর্ণ, ইলমের অধিকারী ও আদলপন্থী ও ন্যায়বিচারকারী। তিনি একটি পর্যায়ে লিখেছেন,

غالمؤمنون اهل السنة هم يقاتلون في سبيل الله و من قاتلهم يقاتل في سبيل الطاغوت‘ كااصديق مع اهل الردة‘ و كعلي بن ابي طالب مع الخوارج المارقين و مع الغلاة و السبائية‘ فاعمالهم خالصة لله –تعلي- موافقة للسنة‘ واعمال مخالفيهم لا خالصة و لا صواباً؛ بل بدعة واتباع هوي‘ ولهذا يسمعون اهل البدع و اهل الاهواء
“আহলুস সুন্নাহর মুমিনরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে ও তাদের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করে তারা তাগূতের রাস্তায় যুদ্ধ করে; যেমনঃ সিদ্দীকের (আবু বকর) মুরতাদদের সাথে যুদ্ধ, খারেজী, অতিরঞ্জনকারী ও সাবেঈদের সাথে আলীর যুদ্ধ। তাদের (আহলুস সুন্নাহর) আমল আল্লাহর জন্য খালিস ও সুন্নাতমাফিক ছিলো এবং তাদের বিরোধীতাদের আমল না খালিস ছিলো আর না সঠিক, বরং তা ছিলো বিদআত ও প্রবৃত্তির অনুসরণ। আর এ কারণেই তাদেরকে আহলুল বিদআত ও আহলুল হাওয়া বলা হয়ে থাকে।” (আল-ইস্তিগাছা, পৃঃ ২৫২
)
.[/q]

ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহর কথা অনুযায়ী এদেরকে বিদআতী বলা হয় কেননা এরা কিতাব, সুন্নাহ ও ইজমায়ে সাহাবার বিপক্ষে এমন কিছু উদ্ভাবন করে ও দ্বীনের অংশ বানিয়ে নেয় যা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং সেসকল বিদআতীরা আহলুস সুন্নাহকে তাদের বিদআত না মানার কারণে তাকফীর করে বেড়ায়, তারা আহলুস সুন্নাহর সাথে বিরোধীতায় লিপ্ত হয়। এমন সব বিদআতীরাই সালাফদের সময়ে জন্ম নিচ্ছিলো। তখন আকীদাহর ফিতনা ধীরে ধীরে জন্ম লাভ করতে থাকে, ফিতনা বিস্তারিত ও প্রসারিত হতে থাকে। এসকল বিদআতে মুকাফফারা ও বিদআতে কুবরাকারী সাহিবে বিদআতীদের বিপক্ষেই সালাফরা খগড়হস্ত ছিলেন, চরম কঠোর ছিলেন। কেননা তারা উম্মাহর অভিভাবক, তারা তখন কঠোরতা না দেখালে উম্মাহ এসকল ফিতনায় জর্জরিত হয়ে যেত। মানুষ যাতে তাদের কথাবার্তায় প্রভাবিত না হতে পারে এ কারণে তারা বিদআতীদের সাথে বসতেও মানা করতেন, কারণ, তা মানুষের মাঝে খারাপ আকীদাহ ছড়িয়ে দিতে পারে। এসকল বিদআতী ছিলো তারা যাদেরকে আমরা বাতিল ফিরকা নামে চিনি, যেমনঃ খারেজী, মু’তাযিলা, মুরজিয়া, জাহমিয়্যাহ, কাদরিয়্যাহ, জাবরিয়্যাহ ইত্যাদি। কিন্তু অধুনাকালের মাদখালী বা চরমপন্থী সালাফীরা প্রেক্ষাপট যাকে তাকে যেভাবে খুশি সেভাবে বিদআতী বলে ঘোষণা দিচ্ছে। এরা তাদের ঘোষণামত বিদআতীদের থেকে ইলম না নেওয়ার জন্য ফলাও প্রচার করে বেড়াচ্ছে।
.
কিন্তু এদের মত চুন থেকে পান খসলেই বিদআতী বলে দিলে ইলমের ভাণ্ডারই সংকুচিত হয়ে যেত। কেউ আলী, হাসান হুসাইনদের সাথে আলাইহিস সালাম বললে তার থেকে ইলম নেওয়া বন্ধ, কেউ আলীকে উছমান থেকে উত্তম বললে তার জন্য দরজা বন্ধ, কেউ সাহাবীদের মুশাজারাতের ক্ষেত্রে (খুব বেশি অতিরঞ্জন) ব্যতিরেকে ভিন্নমত রাখলে সে তো পুরাই শেষ, সিফাতকে (মাত্রাতিরিক্ত না বৈধতার মাঝে) তা’বিল করলে তার চাকরীই নট। কিন্তু ইলমের বড় বড় ভাণ্ডারগণ এমনটা মনে করতেন না বিদআত ও সেই বিদআতের অনুসরণের ক্ষেত্রে। যেমন ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবী লিখেছেন,
.

أن البدعة على ضربين: فبدعة صغرى؛ كغلو التشيع، أو كالتشيع بلا غلو ولا تحرف، فهذا كثير في التابعين وتابعيهم مع الدين والورع والصدق. فلو رد حديث هؤلاء لذهب جملة من الآثار النبوية، وهذه مفسدة بينة ثم بدعة كبرى؛ كالرفض الكامل والغلو فيه، والحط على أبي بكر وعمر -رضي الله عنهما-، والدعاء إلى ذلك، فهذا النوع لا يحتج بهم ولا كرامة
“বিদআত দু’প্রকার; এক. বিদআতে সুগরা; যেমনঃ শিয়াদের অতিরঞ্জন অথবা অতিরঞ্জন ও বিকৃতি ব্যতিরেকেই শিয়াপন্থা, এ প্রকারের বিদআত তাকওয়া ও সত্যবাদীতার অধিকারী অনেক তাবিঈ ও তাবি-তাবিঈদের মাঝেও পাওয়া যায়। যদি এদের হাদীছও প্রত্যাখ্যান করা হয় তবে নবীজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীছের একটি অংশই প্রত্যাখ্যাত হবে, আর তা সুস্পষ্ট বিপর্যয়-ফাসাদ। দুই. বিদআতে কুবরা; যেমনঃ পরিপূর্ণ রাফেযী, যার মাঝে অতিরঞ্জনও ভরপুর, যারা আবু বকর ও উমারের মর্যাদাহানি করে ও তাদের বিরুদ্ধে দুআ করে, (ইলমের জন্য) এ শ্রেণীর মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন নেই, আর না তাদের সম্মান করার জরুরত আছে।” (মি’যানে ই’তিদাল)

.
ইমাম ইবনু হাজার লিখেছেন,

فالتشيع في عرف المتقدمين هو اعتقاد تفضيل عليّ على عثمان, وأن عليًّا كان مصيبًا في حروبه، وأن مخالفه مخطئ، مع تقديم الشيخين وتفضيلهما, وربما اعتقد بعضهم أن عليًّا أفضل الخلق بعد رسول الله -صلى الله عليه وآله وسلم-, وإذا كان معتقد ذلك ورِعا ديّنًا صادقًا مجتهدًا فلا ترد روايته بهذا, لا سيما إن كان غير داعية, وأما التشيع في عرف المتأخرين فهو الرفض المحض، فلا تقبل رواية الرافضي الغالي

“মুতাকাদ্দিমীনদের সময় শিয়াবাদ কেবল উছমানের ওপর আলীর ফযীলতদান, যুদ্ধে আলীকে সত্যপন্থী ভাবা ও তার বিরোধীতাকারীদের ভুলপথ অভিমুখী মনে করা, তবে এক্ষেত্রেও আবু বকর ও উমারকে আলী থেকে উত্তম বলে মনে করা হত অথবা কখনো কখনো আলীকে রাসুলুল্লাহর পর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বলে মনে করার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো। এ পর্যায়ের ব্যক্তি যখন তাকওয়াবান, দ্বীনদার, সত্যবাদী, মুজতাহিদ হবে; তাদের বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করা হবে না, তবে তারা বিদআতের দিকে আহ্বানকারী হবে না। পরবর্তীতে শিয়াবাদ হয়ে গেলো নিখাঁদ রাফেজীপন্থা, এ ধরণের সীমালঙ্ঘনকারী রাফেজী থেকে বর্ণনা গ্রহণ করা হবে না।” (তাহযীবুত তাহযীব)
.

এরা মানুষকে বলে বেড়ায় হিযবী বা দলবাজ। কিন্তু এরাই আসলে বড় দলবাজ। শায়খ আলবানী, শায়খ বিন বায, শায়খ উছাইমীন, শায়খ সালিহ আল-ফাওযান, শায়খ রাবী বিন মাদখালী এরাই হলো আলিম, বাকী সবাই তালিবে ইলম অথবা নস্যি। ওপরের শায়খরা যাকে আলিম বলবেন সে-ই আলিম বাকী সবাই ফাঁকা, কিন্তু ওপরের আলিমদেরকে কে তাওছীকের অধিকার দিলেন? শায়খ রাবীকেই-বা কোন ব্যক্তি জারহু ওয়াত তা’দীলের শাস্ত্রকে পুনর্জাগরণের অনুমতি দিলেন? এসবের কোনো উত্তর নেই। এদের কথা মানতে গেলে আহলুস সুন্নাহর অনেক বড় বড় আলেমদেরকে বিদআতী অথবা বিদআতের অনুসরণকারী ঠাওরাতে হবে, তাঁদেরকে তা’লিবে ইলম ভাবতে হবে, ক্ষেত্রবিশেষে তাঁদের থেকে ইলম নেওয়াও বন্ধ করে দিতে হবে।

- হোসাইন শাকিল

পঠিত : ৩১৮ বার

মন্তব্য: ০