Alapon

পৃথিবীর শেষ সময়ে কী ঘটবে...?



কন্সট্যান্টিনোপল বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী

কন্সট্যান্টিনোপল শহরের নামকরণ করা হয় রোমান সম্রাট কনস্টানটাইন-এর নামানুসারে। এ শহরকে তিনি রাজধানীতে পরিণত করেন। সম্রাটের নামানুসারে শহরের নামকরণ সে সময় কমন ব্যাপার ছিল।

কন্সট্যান্টিনোপল প্রায় এক হাজার বছর মানব সভ্যতার স্বর্গভূম ছিল। ইসলাম আগমন অবধি অন্য কোন সভ্যতা এর সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারেনি। প্রায় এক হাজার বছর কন্সট্যান্টিনোপল ছিল সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র। বিস্ময়করভাবে রাসূল সা. ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, কন্সট্যান্টিনোপল আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসবে।

আমরা কয়েক শতাব্দী পর এ বিজয়কে সেভাবে ফিল করছি না, অথচ রেকর্ডেড মানব ইতিহাসের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ১৪৫৩ সাল তথা কন্সট্যান্টিনোপল বিজয়। এটাকে আমরা গৃহীত হিসেবেই ধরে নিই, আমাদের কাছে এটা যেন কেবলেই একটি পাদটীকা। আমাদের অধিকাংশ শিশুরা এ বিজয়ের কোনো সূত্রই খুঁজে পায় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটা ছিল মধ্যযুগের ইতিহাসে ঘটা সবচেয়ে ক্যাটাক্লিজমিক (ভয়াবহ সংঘাতপূর্ণ) তথা রাজনৈতিক পালাবদলের ঘটনা। এর মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্যের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং ইসলামের বিজয় সূচিত হয়।

আমিরে মুয়াবিয়া রা.-এর চেষ্টা

আমিরে মুয়াবিয়া রা. বাইজান্ট্যাইন, রোমান সাম্রাজ্য জয় করার চেষ্টা করেছিলেন। তখন আবু আইয়ুব আনসারী রা. কন্সট্যান্টিনোপল শহরের ঠিক বাহিরে শাহাদাত বরণ করেন। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।

মুহাম্মদ ফাতেহ-এর সফলতা

সাহাবাদের সময় থেকে মুসলিমরা তা বিজয়ের জন্য বারবার চেষ্টা করে আসছিলেন। অনেক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু এটা সুলতান ফাতেহ-এর জন্য জন্য অসম্পাদিত থেকে গিয়েছিল। সুলতান ফাতেহ হলেন দ্বিতীয় মুহাম্মদ। তিনি ১৪৫৩ সালে কন্সট্যান্টিনোপল জয় করেন। এবং একে ইস্তাম্বুল রূপান্তরিত করেন।

ব্যক্তিগত ফুটনোট। আয়া সোফিয়া এক বিস্ময়কর মানব মনের বহিঃপ্রকাশ। এটা তৈরি হয়েছিল রাসূল সা.-এর জন্মের পূর্বে। আর আমরা এখনও তা অবাক বিস্ময়ে দেখি, মুগ্ধ হই। কল্পনা করতে পারেন, সে সময়ের মানুষজনের দক্ষতা! এখনও তা আমাদের কাছে কত সুবিশাল! এটি নির্মিত হয়েছে কোনো পিলার ছাড়া, কোনো বিম (কড়িকাঠ) ছাড়াই। আর তা ঠাই দাঁড়িয়ে আছে পনেরশো বছরেরও বেশি সময় ধরে। এ হলো তাদের সভ্যতার একটি অ্যাসপেক্ট। তা আলোচনার উদ্দেশ্য রাসূল সা. যখন কন্সট্যান্টিনোপল বিজয়েরে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, তখন মুসলমানরা ছিল ছিল নির্যাতিত, দুর্বল।

রাসূল সা.এর ভবিষ্যদ্বাণীকৃত বিজয়

যাহোক, মুহাম্মাদ ফাতেহ কন্সট্যান্টিনোপল জয় করেছেন। তা এক অসাধারণ কীর্তি। কিন্তু অন্যান্য হাদীস বলছে রাসূল সা.-এর ভবিষ্যদ্বাণীকৃত বিজয় সংঘটিত হবে একেবারে পৃথিবীর শেষ সময়; তখন দাজ্জালের আত্মপ্রকাশের সময় খুবই ঘনিয়ে আসবে, তখন ইমাম মাহদি দুনিয়ায়।

এই বর্ণনা আমাদের চিন্তাকে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। ইস্তাম্বুল তো ইস্তাম্বুলই আছে। হাদিসের ভবিষ্যৎবাণী কি তা আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। এ বিষয়ে আমার কাছে সুস্পষ্ট কোনো উত্তর নেই। তবে যে কথাটি আমি বলতে পারি তা হলো এ ভূমিটি পুনরায় অমুসলিমদের কাছে কিংবা যারা ইসলামকে অপছন্দ করে তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, হয়তো বা এমনও হতে পারে এমন কারও নিকট ফিরে যাবে যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবী করবে, কিন্তু মূলত তারা হবে ইসলাম বিরোধী। তবে প্রকৃত সত্য আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।
অনেকে বলেন, আতাতুর্কের সময়কে দারুল কুফর গভমেন্ট বলা যায়। কিন্তু আলহামদুল্লিাহ এখন ইস্তাম্বুল মুসলিম ভূমি। সম্ভবত, এই ভূমির নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হয়ে যাবে। ইস্তাম্বুল মুসলিমরা পুনরায় জয় করবেন। হাদিস আরো বলছে, এই বিজয় সাধিত হবে কোন রক্তপাত ছাড়াই, অলৌকিকভাবে। সুলতান ফাতেহ যেভাবে জয় করেছেন ঠিক সেভাবে নয়। সুলতান ফাতেহ-এর বিজয়ের সময় ভীষণ যুদ্ধ হয়েছে। এতে ব্যাপক রক্তপাত হয়েছে। এ যুদ্ধ স্থায়ী কয়েক মাস স্থায়ী ছিল । সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী দীর্ঘ সময় এ শহর অবরোধ করে রেখেছিল। এটা একটা স্ট্যান্ডার্ড যুদ্ধ ছিল। অনেক সৈন্য মৃত্যুবরণ করেছে।

হাদিসের ভবিষ্যৎবাণীকে জোর করে বাস্তবায়নের অপচেষ্টা সঠিক নয়। (যেমন কয়েকবার কিছু উন্মাদ নিজেকে ইমাম মাহদি দাবি করেছে।) হাদিসের ভবিষ্যদ্বাণী স্বাভাবিকভাবেই বাস্তবায়িত হবে। আলহামদুলিল্লাহ, সুলতান ফাতেহ এটি জয় করেছেন, কিন্তু হাদিসের ভবিষ্যৎবাণী এ বিজয় সম্পর্কে ছিল না।

আমি এখন যে হাদীসটি বর্ণনা করব এর বর্ণনাসূত্র দুর্বল। আমি তা বর্ণনা করছি এবং বলেই দিচ্ছি যে এটা দুর্বল হাদিস। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. বলেন, তোমরা কিস্তিনতিনিয়্যায় তিনবার যুদ্ধ করবে। কিস্তিনতিনিয়্যাহ দ্বারা তিনি কী কনস্টান্টিনোপল বুঝিয়েছেন, নাকি কনস্টান্টিনোপল সাম্রাজ্য অর্থাৎ ইউরোপীয়দের বুঝিয়েছেন তা সুস্পষ্ট নয়। যাহোক, তিনি বলেন, তোমরা এর জন্য তিনবার যুদ্ধ করবে। প্রথমবার ভালো করবে, কিন্তু সফল হবে না। দ্বিতীয়বার তোমরা বিজয়ী হিসেবে তাতে প্রবেশ করবে এবং এতে মসজিদ নির্মিত হবে। এটা সত্যিই অদ্ভুত। কারণ কনস্টান্টিনোপলে ১৪৫৩ সালের আগে কোনো মসজিদের অস্তিত্ব ছিল না।

অতপর তিনি বলেন, তোমরা তৃতীয়বার ফিরে আসবে এবং তা তাকবীর ধ্বনি দিয়ে জয় করবে। তোমরা বলবে, আল্লাহু আকবার আর তা বিজিত হবে। রাসূল সা. বলেন, এর এক তৃতীয়াংশ ধ্বংস হবে, এক-তৃতীয়াংশ অগ্নিদগ্ধ হবে, এক-তৃতীয়াংশ তোমাদের মাঝে বন্টন হবে। এ হাদীসে শেষ দিকে আরেকটি বিজয়ের ইঙ্গিত করছে। হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে নুয়াইম ইবনে হাম্মাদের কিতাবুল ফিতান গ্রন্থে।

আমি এখন যে হাদীসটি বর্ণনা করব তা সহিহ হাদিস। বর্ণিত এ দুটি হাদিস একত্র করলে কিছু কনসেপ্ট পাওয়া যায়। রাসূল সা. সাহাবাদের বলেন, তোমরা কি এমন শহরের নাম শুনেছো যার অর্ধেক পানি আর অর্ধেক ভূমি? অন্য বর্ণনায় আছে তোমরা কি এমন শহরের নাম শুনেছো যার একাংশে পানি আর অন্য অংশে ভূমি রয়েছে? সাহাবায়ে কেরাম বলেন, হ্যাঁ।

অধিকাংশ ব্যাখ্যাকারক বলেন, এর দ্বারা কনস্টান্টিনোপল উদ্দেশ্য। কনস্টান্টিনোপল এশিয়া ও ইউরোপকে বসফরাস প্রণালীর মাধ্যমে বিভক্ত করেছে। এ শহরটা মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। ইমাম নববীসহ আলেমরা বলেছেন, এটা কনস্টান্টিনোপল। রাসূল সাল্লাহু সাল্লাম বর্ণনা করেন, তোমরা মনোযোগ দিয়ে শুনো--- কেয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না বনি ইসহাক তা জয় করবে। লক্ষ করুন, বনি ইসমাইল এর কথা বলা হচ্ছে না।

সেখানে বনি ইসহাক তা তরবারীর মাধ্যমে জয় করবে না, তারা তীর দিয়ে যুদ্ধ করবে না; বরং তারা বলবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার একবার বলার পর শহরের একটি দেওয়াল ধসে যাবে। এভাবে তারা চারবার বলবে, চারটি দেওয়াল ধসে যাবে। অতঃপর তারা শহরে প্রবেশ করবে এবং গনিমত বন্টন বন্টন শুরু করবে। তারা যখন গনিমত বন্টন শুরু করবে তখন শয়তান ডাক দিবে, অর্থাৎ একজন ক্রন্দনকারী ডেকে বলবে, দাজ্জাল তোমাদের পরিবারে আবির্ভূত হয়েছে। তারা সবকিছু ত্যাগ করে পরিবারের নিকট ফিরে যাবে। হাদিস সমাপ্ত হয়েছে।

বনি ইসহাক

বনি ইসহাক কারা? কিছু আলেম বলেন এর দ্বারা রোমানদেরকে বুঝানো হয়েছে। বনি ইসহাক দ্বারা সাধারণত ইহুদীদের বুঝানো হয় না। ইহুদিদের বোঝানো হয় বনি ইসরাইল দ্বারা। ইসরাইল হলো ইয়াকুব (জ্যাকব) আ.।

ইসহাক আ.-এর ছিল দুই সন্তান। ইস ও ইয়াকুব। কিছু ব্যাখ্যাকার বলেন, আরবরা মনে করে রোমানরা ইস আ.এর বংশধর। বনি ইসহাক দ্বারা রোমানদেরকে বুঝানো হয়। অন্য একটা ব্যাখ্যা হল তারা হবে ইহুদি থেকে ধর্মান্তরিত মুসলিম ।

কিছু স্কলার বলেন, রাসূল সা. মূলত বলেছিলেন বনি ইসমাইল কিন্তু একজন বর্ণনাকারী তা গুলিয়ে ফেলেছে। আমি এই অভিমতের সাথে দ্বিমত পোষণ করি। এটা বাস্তব সম্মত নয়। কারণ, বনি ইসহাক শব্দযুগল সাধারণত হাদিসে ব্যবহৃত হযনি। অতএব কারো গুলিয়ে ফেলা প্রায় অসম্ভব। বিষয়টি আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।

৭০ হাজার; জেনেরিক নাম্বার

হাদিসে বলা হচ্ছে, ৭০ হাজার। অন্য হাদীসেও খুব স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে তাদের সংখ্যা হবে ৭০ হাজার। তবে আরবিতে সাত, সত্তর, সাতশ, সত্তর হাজার বলতে ঠিক একই সংখ্যা বোঝায় না। সত্তর হাজার বলতে এখানে একটা বড় সংখ্যা বোঝানো হচ্ছে। হয়ত বা এক লাখ কিংবা পঞ্চাশ, ষাট হাজার। আমরা যেমন বাংলায় বলি, হাজার হাজার। এটা একটা জেনেরিক নাম্বার। এর দ্বারা আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করা হয় না।

রাসূলুল্লাহ সা. যেন বলছেন ৭০ হাজার ধর্মান্তরিত মুসলিম কন্সট্যান্টিনপোল জয় করবে। তারা মুসলিমদের সাথে মিলে যুদ্ধ করবে আর এই ধর্মান্তরিত মুসলিমদের হাতেই আল্লাহ তায়ালা বিজয় দান করবেন। জন্মগত মুসলিমদের হাতে নয়। আল্লাহ তায়ালা তাদের বাছাই করে নেবেন। যখন তারা তাকবীর ধ্বনি দেবে, তাদের তাকবীর ধ্বনির ফলে শহরের দেয়াল ধসে পড়বে। অতঃপর তারা কনস্টান্টিনোপল বিজয় লাভ করবে। আমার কাছে এটাই স্টান্ডার্ড ব্যাখ্যা মনে হয়।

বেশ কিছু সংখ্যক স্কলার বলেন বলেন, পানি ও ভুমি বলে ভেনিস শহরকে বোঝানো হয়েছে। আমি বলি তাও হতে পারে। আল্লাহ তায়ালাই প্রকৃত সত্য ভালো জানেন। আমি তা অস্বীকার করতে পারি না। কারণ হাদিসে সরাসরি কিস্তিনতিনিয়্যাহ বলা হয়নি। তবে অন্যান্য হাদিসে কিস্তিনতিনিয়্যাহ শব্দ বারবার এসছে, কিন্তু ভেনিস শহরের নাম কোথাও উল্লেখ নেই।

এরূপ একটি হাদিসে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। রাসূল সা. বলেন ৭০ হাজার বনি ইসহাক কনস্টান্টিনোপল জয় করবে। অতএব বর্ণনাগুলোকে একত্র করলে একটা খুবই যুক্তিসঙ্গত ন্যারেটিভ দাঁড়ায়। ইমাম মাহদি পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ করবেন। একটা যুদ্ধ অন্যটার চেয়ে তীব্রতর হবে। আর এসব শেষ যুদ্ধগুলোর একটি পর্যায়ে কনস্টান্টিনোপল বিজয় হবে, কিন্তু এতে কোনো লড়াই হবে না, কোন রক্তপাত হবে না, তরবারী ব্যবহৃত হবে না, তির ধনুক ব্যবহৃত হবে না। এটা হবে এক অলৌকিক বিজয়।

৭০ হাজার বনি ইসহাক কন্সট্যান্টিনোপলের উপকণ্ঠে সমবেত হবে,তারা শহরের চারপাশে দেয়াল দেখতে পাবে এবং উপলব্ধি করবে যে, তারা এই শহরের অধিবাসীদের সাথে যুদ্ধ করার মতো যথেষ্ট শক্তি রাখে না, সক্ষম না, কিন্তু তারা এ হাদীস জানবে। তারা এ হাদিসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে। এ হাদিসে রাসূল সা. বলে দিচ্ছেন সে সময় কী করতে হবে। অতঃপর তারা এই কৌশল প্রয়োগ করবে। তারা বলবে, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার। চারবার তাকবীরের মাধ্যমে দেয়ালগুলো ধসে যাবে। শহরটি কোন রক্তপাত ছাড়াই বিজিত হবে।

এদের সম্পর্কে অন্য হাদিসে রসূল সা. আরও বলেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না রোমীয় (সিরিয়ার অন্তর্গত) সেনাবাহিনী আমাক অথবা দাবিক নহরের কাছে অবতীর্ণ হবে। তখন তাদের মুকাবিলায় মাদীনা হতে এ দুনিয়ার সর্বোত্তম মানুষেরর এক দল সৈন্য বের হবে। তারপর উভয় দল সারিবদ্ধভাবে যুদ্ধের জন্য দণ্ডায়মান হবার পর রোমীয়গণ বলবে, তোমরা ঐ সমস্ত লোকেদের থেকে পৃথক হয়ে যাও, যারা আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে অর্থাৎ ধর্ম ত্যাগ করেছে। আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করব।

তখন মুসলিমগণ বলবে, আল্লাহর শপথ! আমরা আমাদের ভাইদের থেকে কখনও সম্পর্কচ্ছেদ করব না। পরিশেষে উভয় দলের মধ্যে যুদ্ধ হবে। এ যুদ্ধে মুসলিমদের এক তৃতীয়াংশ সৈন্য পলায়ন করবে। আল্লাহ তায়ালা কখনও তাদের তাওবা কবুল করবেন না। সৈন্যদের এক তৃতীয়াংশ নিহত হবে এবং তারা হবে আল্লাহর কাছে শহীদানের মাঝে সর্বোত্তম শাহীদ। আর সৈন্যদের অপর তৃতীয়াংশ বিজয়ী হবে। জীবনে আর কক্ষনো তারা ফিত্‌নায় আক্রান্ত হবে না। তারাই কন্সট্যান্টিনোপল বিজয় করবে।

অতঃপর, তারা নিজেদের তালোয়ার যাইতুন বৃক্ষে ঝুলিয়ে রেখে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ভাগ করতে থাকবে। এমতাবস্থায় তদের মধ্যে শয়তান উচ্চৈঃস্বরে বলতে থাকবে, দাজ্জাল তোমাদের পেছনে তোমাদের পরিবার-পরিজনের মধ্যে চলে এসেছে। এ কথা শুনে মুসলিমরা সেখান থেকে বের হবে। অথচ এ ছিল মিথ্যা সংবাদ। তারা যখন পুনরায় বিলাদুশ শাম (সিরিয়া) পৌঁছবে তখন সত্যিই দাজ্জালের আগমন ঘটবে। যখন মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করবে এবং সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান হতে শুরু করা মাত্র সলাতের সময় হবে। অতঃপর ঈসা আ. অবতরণ করবেন এবং সলাতে তাদের ইমামতি করবেন। আল্লাহর শত্রু তাকে দেখামাত্রই বিচলিত হয়ে যাবে যেমন লবণ পানিতে মিশে যায়। যদি ঈসা আ. তাকে কিছু না করেও ছেড়ে দেন তবে তারা নিজে নিজেই বিগলিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। অবশ্য আল্লাহ তায়ালা দাজ্জালকে ঈসা আ.-এর হাতে হত্যা করাবেন এবং তার রক্ত ঈসা আ.-এর বর্শাতে রঞ্জিত হবে। তিনি মুসলিমদেরকে তা দেখিয়ে দিবেন। ( আবু হুরাইরা রা. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৭১৭০, ই.ফা. ৭০১৪, ই.সে. ৭০৭১, সোর্স- আল হাদিস অ্যান্ড্রোয়েড অ্যাপ)

মানব ইতিহাসের ভয়াবহ যুদ্ধ

হাদিসে বর্ণিত আছে। ইউসায়ির ইবনে জাবির হতে বর্ণিত। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, কিয়ামত ততক্ষণ সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না উত্তরাধিকার সম্পদ অবণ্টিত থাকবে এবং মানুষেরা গনীমাতের বিষয়ে আনন্দ প্রকাশ করবে না। তারপর তিনি নিজ হাত দ্বারা সিরিয়ার প্রতি ইশারা করে বললেন, আল্লাহর শত্রুরা একত্রিত হবে মুসলিমদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য এবং মুসলিমগণও তাদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য একত্রিত হবে।

এ কথা শ্রবণে আমি বললাম, আল্লাহর শত্রু বলে আপনি কি রোমীয় (খ্রীষ্টান) সম্প্রদায় উদ্দেশ্য করছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ! তখন ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হবে। তখন মুসলিম জাতি একটি দল অগ্রে প্রেরণ করবে, তারা মৃত্যুর জন্য সম্মুখে এগিয়ে যাবে। বিজয় অর্জন করা ছাড়া তারা প্রত্যাবর্তন করবে না। এরপর পরস্পর তাদের মধ্যে যুদ্ধ হবে। যুদ্ধ করতে করতে রাত্রি অতিবাহিত হয়ে যাবে। তারপর দুপক্ষের সৈন্য জয়লাভ করা ছাড়াই ফিরে চলে যাবে। যুদ্ধের জন্য মুসলিমদের যে দলটি এগিয়ে গিয়েছিল তারা প্রত্যেকেই মৃতুবরণ করবে। অতঃপর পরবর্তী দিন মুসলিমগণ অপর একটি দল সামনে পাঠাবে। তারা সবাই মৃতুবরণ করবে। অতঃপর পরবর্তী দিন মুসলিমগণ অপর একটি দল সামনে পাঠাবে। তারা বিজয়ী না হয়ে ফিরবে না। এদিনও পরস্পরের মধ্যে মারাত্মক যুদ্ধ হবে। পরিশেষে সন্ধ্যা হয়ে যাবে। উভয় বাহিনী বিজয়লাভ করা ছড়াই স্বীয় শিবিরে প্রত্যাবর্তন করবে। যে দলটি সামনে ছিল তারা সরে যাবে।

অতঃপর তৃতীয় দিন আবার মুসলিমগণ মৃতু বা বিজয়ের উদ্দেশে অপর একটি বাহিনী পাঠাবে। এ যুদ্ধ সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে থাকবে। পরিশেষে বিজয়লাভ করা ছাড়াই উভয় বাহিনী প্রত্যাবর্তন করবে। তবে মুসলিম বাহীনীর সামনের সেনাদলটি শাহীদ হয়ে যাবে।

তারপর যুদ্ধের চতুর্থ দিনে অবশিষ্ট মুসলিমগণ সকলেই যুদ্ধের জন্য সামনে এগিয়ে যাবে। সে দিন কাফিরদের উপর আল্লাহ তায়ালা অকল্যাণ চক্র চাপিয়ে দিবেন। তারপর এমন যুদ্ধ হবে যা জীবনে কেউ দেখেনি। পরিশেষে তাদের শরীরের উপর পাখী উড়তে থাকবে। আর কোনো পাখী তাদেরকে জীবিত অতিক্রম করতে পারবে না। অর্থাৎ যুদ্ধ এতোই ভয়াবহ হবে যে তারা যুদ্ধের ময়দান অতিক্রমকালে মরে নিচে পড়বে। এ থেকে অনুমান করা যায়, সে সময় হয়ত তরবারির যুদ্ধ নয়, পারমানবিক যুদ্ধও হতে পারে। কারণ তরবারির যুদ্ধ যত ভয়াবহই হোক না কেন এতে পাখি মরা সম্ভব না।

যুদ্ধ এতোই ভয়াবহ হবে যে একশ জন মধ্যে মাত্র একজন বেঁচে থাকবে। এমন সময় কীভাবে গনীমাতের সম্পদ নিয়ে লোকেরা আনন্দোৎসব করবে এবং কেমন করে উত্তরাধিকার সম্পদ ভাগ করা হবে। অর্থাৎ আপনার পরিবারে যদি কেউ বেঁচে না থাকে তখন আপনি আর সম্পদ দিয়ে কী করবেন।

এমতাবস্থায় মুসলিমগণ আরেকটি ভয়ানক বিপদের খবর শুনতে পাবে এবং এ মর্মে একটি শব্দ তাদের কাছে পৌঁছবে যে, দাজ্জাল তাদের পেছনে তাদের পরিবার-পরিজনের মধ্যে চলে এসেছে। এ সংবাদ শুনতেই তারা হাতের সমস্ত কিছু ফেলে দিয়ে রওনা হয়ে যাবে এবং দশজন অশ্বারোহী ব্যক্তিকে সংবাদ সংগ্রাহক হিসেবে পাঠাবেন। রাসূল সা. বলেন, দাজ্জালের খবর সংগ্রাহক দলের প্রতিটি লোকের নাম, তাদের বাপ-দাদার এবং তাদের ঘোড়ার রং সম্পর্কেও আমি জ্ঞাত আছি। এ পৃথিবীর সর্বোত্তম অশ্বারোহী দল সেদিন তারাই হবে।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৭১৭৩, ই.ফা. ৭০১৭, ই.সে. ৭০৭৪, আল হাদিস অ্যান্ড্রোয়েড অ্যাপ)

[ইয়াসির ক্বাদির চার পাঁচটি লেকচার থেকে তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে]

পঠিত : ৩০০ বার

মন্তব্য: ০