Alapon

বিএনপি কর্তৃক রবি ঠাকুরের আত্মার শান্তি কামনা ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা


০১.

রবিন্দ্রনাথের আত্মার শান্তি কামনা করেছে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন জনাব তারেক রহমান। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো রবিন্দ্রনাথ বাংলাদেশের কী? বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তার অবদান কী? জমিদার রবি ঠাকুর তো ছিলো আজন্ম বাংলার মানুষদের হেয়কারী। তুচ্ছতাচ্ছিল্যকারী। বিশেষত মুসলমানদের প্রতি ছিলো তার রাজ্যের এলার্জি। এই লোকটা এক প্রকার বাংলাদেশের অস্তিত্বেরও বিরোধী ছিলো। হ্যাঁ, সে অত্যন্ত উঁচুমানের কবি ও সাহিত্যিক ছিলেন। বাংলাদেশের মানুষ বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে সর্বোচ্চ তার সাহিত্যের বিষয় আশয় নিয়ে মূল্যায়ন ও সম্মান প্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু তাকে বাংলাদেশের জাতিসত্তার সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে ফেলতে হবে কেন?

তিনি ছিলেন অমুসলিম, দ্বীন হিসেবে আল ইসলামের প্রতি অবিশ্বাসী ;তাহলে কোন যুক্তিতে একজন মুসলিম তার আত্মার মাগফিরাত বা শান্তি কামনা করবে? বিএনপির উচিৎ ছিলো ভোটের রাজনীতি করা, কিন্তু তারা এখন খাটের রাজনীতিও শুরু করেছে। এভাবে ভোটের রাজনীতি বাদ দিয়ে খাটের রাজনীতি করলে তো হবে না। এভাবে চলতে থাকলে কিন্তু ক্ষমতায় আসার চিন্তা আর করা লাগবে না। একবার অমুকের খাট আরেকবার তমুকের খাটে শুতে শুতেই দিন যাবে, কিন্তু জনগণের ভোটে আর ক্ষমতায় যাবার চিন্তা করা লাগবে না।

০২.
ভারতের সাহায্যে পাকিস্তান ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাক, এক মুসলিম অন্য মুসলিম ভাইয়ের রক্ত ঝরিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাক; একাত্তরের সময় এটিই ছিলো পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর দৃষ্টিভঙ্গি। সেই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যদি জামায়াতকে স্বাধীনতার শত্রু, বাংলাদেশের দুশমন ইত্যাদি বয়ান হাজির করে শাহবাগ তৈরি হতে পারে, তাহলে সেই একই যুক্তিতে (রবি ঠাকুরের তারচেয়ে বাজে কাজের কারণে) রবি ঠাকুর ও রবি ঠাকুরের পূজারিদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা যাবে না কেন? রবি ঠাকুর এবং ঠাকুরের পূজারিদেরকে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না কেন?

০৩. জামায়াত ছিলো বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের সবচেয়ে বড়ো সামাজিক ও রাজনৈতিক এক কার্যকরী শক্তি। ইসলাম বিদ্বেষী বামেরা শাহবাগ কায়েম করে জামায়াতের ওপর হাসিনার ক্র‍্যাকডাউন চালানোর বৈধতা তৈরি করে মূলত ইসলামপন্থী শক্তির কোমর ভেঙে দিয়েছে। মুসলমানদের পক্ষের আরেকটা বিরাট শক্তি কওমি মাদরাসা ভিত্তিক হেফাজতে ইসলামের অবস্থাও নাজেহাল করে ছেড়েছে। এরপর থেকে এখন বাংলাদেশ চলে শাহবাগী এজেন্ডাতেই। শাহবাগীরা ঠিক যেই মূল্যবোধ চায়, বাংলাদেশে এখন সেই মূল্যবোধই জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। যেমন এবারের পাঠ্যক্রম এর জ্বলন্ত নজির। এরপর শাহবাগীরা যাকে হিরো হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়, বাংলাদেশে তাকেই হিরো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যার ফলাফল হচ্ছে বিএনপি কর্তৃক শাহবাগীদের পূজনীয় রঠাকে নিয়ে বিবৃতি। তা-ও এমন বিবৃতি, যেখানে তার আত্মার মাগফিরাতও কামনা করা হয়ে যায়!


বাংলাদেশের রাজনীতিতে রবি ঠাকুরকে নিয়ে
বিবৃতি দেওয়া উচিৎ কী উচিৎ না, ঠিক না বেঠিক সেটা নিয়ে কোনো মন্তব্য করছি না আমি, এটা রাজনীতিবিদরা ঠিক করবে। বা তারা সমালোচনা ও পর্যালোচনা করবে। আমার কথা হলো একজন মুসলিম রাজনীতিবিদ হিসেবে একজন অমুসলিম ব্যক্তির আত্মার শান্তি বা মাগফিরাত কীভাবে কামনা করা যায় কীভাবে? অন্যকোনোভাবেও তো তাকে সম্মান জানানো যেতে পারতো, যেহেতু তাকে নিয়ে ভক্তিতে গদগদ হওয়াটা এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে গেছে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের জন্য!

আসলে শাহবাগ জুলুমের মাধ্যমে তার চিন্তা চেতনা, তার মূল্যবোধ বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার এক অনভিপ্রেত চেষ্টা করেছে, করছে এবং করে যাচ্ছে ।

০৪. এসব থেকে অবশ্য একটা বিষয় শিক্ষনীয় আছে আমাদের জন্য, সেটা হচ্ছে -জুলুম মানুষকে তার আদর্শ থেকে সরিয়ে নেয়। সব মতবাদ সব চিন্তা ও দর্শনই মানুষের ওপর জোর করে দেওয়া। আর এই চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা যার থাকবে না, সে কখনো বিজয়ী হবে না। সফল হবে না। এক প্রজন্মের ওপর যেটা চাপিয়ে দেওয়া হয়, পরের প্রজন্ম সেটাকে বাস্তবতা হিসেবে বা আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। এই বিষয়টা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের দিকে তাকালেও বুঝা যায়। লীগ ক্ষমতা কুক্ষিগত করার আগে মানুষ শেখ মুজিবুর রহমানকে এতোটা বেশি "বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু" বলে গলা ফাটাতো না, এখন যতোটা ফাটায়। এর কারণ হচ্ছে শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু হিসেবে মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজকে যে ছেলেটা স্কুলে ভর্তি হয়, সে ছেলেটা শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা আর বঙ্গবন্ধু হিসেবেই পড়তে পড়তে বড়ো হয়। যার কারণে সে অবচেতনেই তাকে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা হিসেবে গ্রহণ করে নেয়।

এই যে আওয়ামী লীগ আর বামেরা এভাবে মানুষের ওপর তাদের নির্দিষ্ট চিন্তা দর্শন আদর্শ ও মূল্যবোধ চাপিয়ে দিয়েছে, এটা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো আক্ষেপ আর অনুতাপ নেই। কিন্তু যখনই আফগান তালেবান তাদের দেশে কোনো আইন জারি করে জনসাধারণকে মানতে বলে, তখনই তারা হাউকাউ শুরু করে দেয়। এভাবে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরাও যখন ইসলামি মূল্যবোধ সম্পন্ন সমাজ ও রাষ্ট্র তৈরি করতে চায়, কিংবা এসবের কথা বলে, তখনই কিন্তু তারা মানবতা ও স্বাধীনতা গেলো গেলো বলে চিৎকার শুরু করে দেয়!

~রেদওয়ান রাওয়াহা

পঠিত : ৩০৫ বার

মন্তব্য: ০