Alapon

ইখওয়ান ও এরদোয়ান সম্পর্কের নতুন মোড় !!



তুরস্ক ও এরদোয়ান, বর্তমান দুনিয়াতে এ দুটি নাম যেন একে অপরের প্রতিচ্ছবি। নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য জ্বালাময়ী বক্তব্য ও জুলুমকারী সরকারের বিরুদ্ধে সুউচ্চ কন্ঠে কথা বলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বের চোখের মণিতে পরিণত হয়েছেন এরদোয়ান। আজও যেখানে মুসলিমরা নির্যাতিত সেখানে এরদোয়ানের প্রতিবাদী বাণী পৌছে যায়। যদিও বর্তমান সময়ে ইখওয়ানের নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীদেরকে মিশরের জালিম শাসক সিসির হাতে তুলে দেওয়ার কারণে বিভিন্ন দেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের মধ্যে একটি নেতিবাচক মনোভাব তৈরী হয়ে উঠছে এরদোয়ানের প্রতি। অবশ্য এরদোয়ানের জন্য এসব নতুন কিছু নয়। রাজনীতি ও আদর্শের আবেগ এ দুটি বিষয়কে আলাদা করে রাজনীতি করতে হয়, যেটাকে বলে প্র্যাগমেটিক রাজনীতি। আর এ বিষয়ে বর্তমান দুনিয়ায় এরদোয়ানের চেয়ে দক্ষ কেউ নেই।

ইখওয়ান ও এরদোয়ানের সম্পর্কের ইতিহাসঃ

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ২০০০ সালের পূর্ব পর্যন্ত তুরস্কের ইসলামী আন্দোলন মিল্লি গুরুশ(সাদেত পার্টির) একজন মধ্যমসারির নেতা ছিলেন। সাদেত পার্টি তখন প্রধান বিরোধীদল হিসেবে তুরস্কের সংসদে ছিল। ২০০০ সালের পূর্বে প্রায় ২০ বছর তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের সাথে এরদোয়ানের সম্পৃক্ততা থাকার কারণে এবং তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর এরবাকানের দল থেকে ১৯৯৪ সালে এরদোয়ানকে ইস্তাম্বুলের মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করেন প্রফেসর এরবাকান। মিল্লি গুরুশ, ইখওয়ান এবং জামায়াতে ইসলামী এ তিনটি সংগঠন মূলত একে অপরের পরিপূরকই ছিল।

তবে এরদোয়ান ২০০১ সালে তুরস্কের ইসলামী আন্দোলন থেকে বের হয়ে ফেতুল্লাহ গুলেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় নতুন পার্টি গঠন করেন একে পার্টি। পশ্চিমা বিশ্ব এরদোয়ানের এই নতুন দলকে স্বাগত জানায় বিশেষ করে ইসরাইল এবং আমেরিকা এরদোয়ানকে সরাসরি সহায়তা করে। এরদোয়ানও তার পার্টি সংবিধানে সরাসরি ইসরাইলকে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেন এবং আমেরিকাকে অন্যতম সহযোগী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে নেন। এরদোয়ানের ক্ষমতায় আরোহন তুস্কের ইসলামী আন্দোলন 'মিল্লি গুরুশ' ভাল চোখে নেয় নি।

কিন্তু বহির্বিশ্বের ইসলামী আন্দোলন সমুহের সাথে এরদোয়ান তার সম্পর্ক আরও মজবুত করেন গুলেনের মাধ্যমে। তখনকার প্রধানমন্ত্রী এরদোয়ান ক্ষমতায় থাকার কারণে ইখওয়ান ও জামায়াতে ইসলামী তুরস্কের ইসলামী আন্দোলনের চেয়ে এরদোয়ানকে গুরুত্ব দেয়া শুরু করে। মূলত ২০০৯ সালের পুর্ব পর্যন্ত মুসলিম দুনিয়ার নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য এরদোয়ানের তেমন কোন জোরালো বক্তব্য নেই। ২০০৯ সালে নির্বাচনের ঠিক পুর্বে ইসরাঈলী প্রেসিডেন্টকে 'ওয়ান মিনিট' নাটকের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং ব্যাপক ভোটে আবারও জয়লাভ করেন যদিও এই শিমন পেরেজকেই ২০০৭ সালে তুরস্কের পার্লামেন্টে এনে ভাষণের সুযোগ করেন দিয়েছিলেন এরদোয়ান।


মিশরের স্বৈরাচারী শাসক হুসনি মোবারকের সাথে এরদোয়ানের সম্পর্ক ছিল অন্য যেকোন দেশের তুলনায় ভাল এবং এ বিষয়ে এরদোয়ানের অনেক বক্তব্য রয়েছে। আরব বসন্ত শুরু হলে এবং হুসনি মোবারকের পতন ঘনিয়ে আসলে এরদোয়ান মিশরের শাসককে জনগণের কথা শুনার আহবান জানান। পরবর্তীতে ইখওয়ান ক্ষমতায় আসলে এরদোয়ান ধারাবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখেন। মুরসীর ইখওয়ানের সাথে এরদোয়ানের সম্পর্ক বৃদ্ধি পেতে শুরু হয়। কিন্তু এক বছরের মাথায় মুরসীর পতন হলে এবং সেনাশাসক আব্দুল ফাত্তাহ সিসি বিদ্রোহের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসলে তুরস্ক ও মিশর দু-দেশ নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে সরিয়ে নেয়ার মাধ্যমে মিশরের সাথে তুরস্কের সম্পর্কের অবনতি হয় বাহ্যিকভাবে।


ইখওয়ানের উপর স্বৈরশাসক সিসির নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সোচ্চার কন্ঠের প্রতিবাদ করে আসছেন ২০১৩ সাল থেকেই। ইখওয়ানের অধিকাংশ নেতাকর্মী সেসময় মিশর থেকে পালিয়ে জর্ডান ও কাতারে অবস্থান নেন। একটি অংশ তুরস্কেও এসে অবস্থান নেন। কাতারের প্রভাবে তুরস্কও ইখওয়ানের নেতা ও কর্মীদেরকে তুরস্কে থাকার অনুমতি প্রদান করে। তুরস্কে অবস্থান করা ইখওয়ানের কর্মীরা অনলাইনে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন। বিভিন্ন মিডিয়া চ্যানেল গঠন করেন এবং তুরস্কে বিভিন্ন সময় ইসলামী আন্দোলনের সহায়তায় বিক্ষোভ সমাবেশও করতে থাকেন। তুরস্ক সরকার তাদেরকে কোন প্রকার বাধা প্রদান করেনি বরং সহায়তা করেছে এসব ক্ষেত্রে।

তুরস্কের অর্থনৈতিক সংকট এবং ইখওয়ানের সাথে সম্পর্কের নতুন মোড়ঃ

২০১৮ সালে দেশটি প্রথম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখী হয় আমেরিকান এক পাদ্রীকে হস্তান্তরের ঘটনার মধ্য দিয়ে। যদিও বিশাল ঋণের বোঝা নিয়ে চলা তুরস্ক সরকারের অর্থনৈতিক দুরবস্থা অনুমেয় ছিল পূর্ব থেকেই। ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তা কেবল ত্বরান্বিত হয়েছিল মাত্র। যদিও অর্থনৈতিক চাপে পরবর্তীতে সেই পাদ্রীকে আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করেণ এরদোয়ান। এরপর থেকেই তুরস্ক আরব দেশের দিকে ঝুকতে শুরু করে নিজের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে। তুরস্কের অর্থনীতির সে সঙ্গিন অবস্থা তা সকলেরই জানা। বর্তমানে মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে পৃথিবীতে ২য় অবস্থানে রয়েছে দেশটি। দ্রব্যমূলের উর্ধ্বগতিতে জনগনের নাভিশ্বাস চরমে। তার উপর দেশটির রিজার্ভের অবস্থাও তেমন সুবিধাজনক নয়। ইসরাইল আমেরিকার সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করেও তেমন লাভ হচ্ছে না। ইসরাইল আমেরিকা ১০ টাকা দিয়ে ১০০০ টাকা আদায় করে নেয়। অন্যদিকে রাশিয়া ও ইরানের অবস্থাও তেমন ভাল নয়। চীন তার ব্যবসা প্রসারিত করছে তুরস্কে, কিন্তু সরকারের প্রয়োজন অস্বাভাবিক অর্থের যোগান যা চীন থেকে আদায় করা সম্ভব নয় কেননা চীন ঋণ প্রদান করবে। আফ্রিকার দেশগুলোর মতো গ্যাড়াকলে পড়তে চাইবে না তুরস্ক।

অন্যদিকে শুধুমাত্র কাতারের উপর ভরসা করাও তুরস্কের জন্য বোকামী। মধ্যপ্রাচ্যে যদি কারও অর্থের ঝনঝনানি শুনা যায় তবে তা হচ্ছে সৌদি-আমিরাত-মিশর বলয়ের অর্থ। যার ব্যাপক প্রয়োজন তুরস্কের। প্রত্যেক রাষ্ট্রই প্র্যাগম্যাটিক পদক্ষেপ নেয় সকল ক্ষেত্রে। সৌদি-আমিরাত-মিশর বলয়ে ঢুকতে হলে বা তাদের থেকে অর্থসাহায্য আদায়ের জন্য অবশ্যই কিছু শর্ত থাকবে। তুরস্কের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হবে না। কেননা এখানে ব্যক্তি বা সংগঠন নয় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কথা হচ্ছে। তাই স্বার্থের প্রশ্ন থাকবে স্বাভাবিক ভাবেই। সৌদি-আমিরাত-মিশর বলয়ের সাথে ইখওয়ানের সম্পর্ক কেমন তা পুরো বিশ্ববাসীই জানে। এই বলয় সরাসরি ইখওয়ানকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে এবং নিজেদের ক্ষমতার জন্য হুমকি হিসেবে মনে করে। সৌদি-মিশর-আমিরাত বলয়ে ঢুকার জন্য প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ২০১৯ সাল থেকেই তৎপরতা চালাচ্ছিলেন। অবশেষে ২০২৩ সালে এসে পুরোপুরি সফল হয়েছে তুরস্ক। তবে এক্ষেত্রে ইখওয়ানের নেতাকর্মীদের বলি পাঠা হিসেবে ব্যবহার করেছে এরদোয়ান ও একে পার্টি। সরকারকে টিকিয়ে রাখতে হলে এছাড়া আর কোন উপায়ও নেই। দেশের চোখে রাষ্ট্রের তুলনায় কোন সংগঠন বড় নয়। প্র্যাগমেটিক এরদোয়ান তাই প্র্যাগমেটিক পদক্ষেপ নিয়েছেন।

মিশরের সিসির সাথে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য তুরস্কে অবস্থানরত অনেক নেতাকর্মীকে মিশর সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে তুরস্কের গোয়েন্দা বাহিনী। যাদের অনেকেরই খোজ পাচ্ছে না তাদের পরিবার। মিডল ইস্ট মনিটর সে বিষয়ে সামান্য এক প্রতিবেদন করেছে। তুরস্ক সরকারের তথ্য অনুয়ায়ী ইখওয়ানের প্রায় ৮০০০ নেতাকর্মী তুরস্কে অবস্থান করছেন। যাদের মধ্য প্রায় হাজারের মতো নেতাকর্মীকে তুরস্ক নাগরিকত্ব প্রদান করেছে। বাকিরা এখনও অবৈধ হিসেবে অবস্থান করছেন তুরস্কে। ২০২০ সালের দিকে কয়েকজন নেতাকর্মীদেরকে মিশর সরকারের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে মিশরের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেন এরদোয়ান। এরই মধ্যে ইখওয়ানের অনেক নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতার করেছে এরদোয়ান সরকার ও গোয়েন্দা বাহিনী। অনেক নেতাকর্মী ভয়ে তুরস্ক থেকে পালিয়ে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়শিয়াতে চলে গিয়েছেন। ইখওয়ানের নেতা যাদের বিরুদ্ধে মিশর সরকার ফাসির আদেশ দিয়েছে তাদের অনেককেই তুরস্ক সরকার নাগরিকত্ব প্রদানের পরিবর্তে নজরবন্দী করে রেখেছে।

এরদোয়ানের এসকল পদক্ষেপের পরই সৌদি বলয়ের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে তুরস্কের। এরদোয়ানের সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সফরে সৌদি ও আমিরাত তুরস্কে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষণা দিয়েছে !! ১০০ বিলিয়ন ডলার তুরস্কের অর্থনীতির জন্য অনেক বড় একটি আশীর্বাদ। বাংলাদেশের সম্পুর্ণ বাজেট যেখানে ৫০ বিলিয়নের আশেপাশে সেখানে ১০০ বিলিয়নের হিসাব মানে দুইটা বাংলাদেশের বাজেটের সমান অর্থ। এত বড় অর্থের কাছে মিশরের একটি সংগঠনের মুল্য কতই বা হতে পারে একটি রাষ্ট্রের কাছে।

তুরস্ক সরকারের এসকল পদক্ষেপে ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা মনক্ষুন্ন হয়েছেন। অথচ রাষ্ট্রের চোখে স্বাভাবিক একটি বিষয়কে আবেগীভাবে দেখার কোন মানে হয় না। তুরস্কে ইখওয়ান ছাড়াও অন্যান্য দেশের অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা অবস্থান করছেন। তারাও এখন আতংকে রয়েছেন।

আবেগ ও বাস্তবতাঃ
অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য তুরস্ককে নতুন করে অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে যা অতি স্বাভাবিক বিষয়। এক্ষেত্রে আবেগকে প্রাধান্য দেয়া বোকামী। তুরস্ক একটি রাষ্ট্র। তাই তাকে রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই অন্য দেশের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করতেই হবে। তুরস্ক সরকারের পলিসি তাই সর্বদা একই রকম। আর একটি সরকারী দলের লক্ষ্য হচ্ছে ক্ষমতায় থাকা। তাই তাদের অভ্যন্তরীন কৌশল এবং বৈদেশিক নীতির কৌশল ভিন্ন হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। রাষ্ট্র আবেগ দিয়ে চলে না। রাষ্ট্রের প্রয়োজন অর্থের। দেশের ভেতরে রাজনীতিতে আবেগ কাজ করলেও বৈদেশিক নীতিতে রাষ্ট্রকে নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করতে হয়। এরদোয়ান এবং একে পার্টি একই পলিসি গ্রহন করেছিল তাদের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই। বর্তমানেও এর ব্যাতিক্রম কিছু হচ্ছে না। এরদোয়ান ও তার দল ইসলামপ্রিয় জনতার ভোটে ক্ষমতায় রয়েছে প্রায় ২১ বছর থেকে।

একটি সরকারী দলের ক্ষমতার উৎস যখন ইসলামপ্রিয় ভোটব্যাংক তখন সেই দল ও দলের প্রধান এ বিষয়টিকে নির্বাচনের পুর্বে ব্যবহার করবেন এটা স্বাভাবিক। কেননা দেশের ভোটব্যাংক গুরুত্বপুর্ণ। দেশের জনগণ আপনাকে নির্বাচিত করে। বহির্বিশ্বের সিম্প্যাথি আপনাকে নির্বাচিত করে না। যেকারণে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান দেশের রাজনৈতিক সভায় নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষে কিছু জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে ভোট আদায় করে নেন যা অতি স্বাভাবিক। কিন্তু নির্যাতনকারী সেই রাষ্ট্রের সাথেও সবধরনের সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও প্রচেষ্টার কোন কমতি রাখেন না। উদাহরনস্বরূপঃ

১) ফিলিস্তিন এবং ইসরাইলঃ
নির্বাচনের পূর্বে এরদোয়ান ও তার দল ফিলিস্তিনের মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধ্ব জ্বালাময়ী সব ভাষণ প্রদান করেন। ইসরাঈলকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দেন। জনগন আবেগে ভোট প্রদান করে।
বাস্তবতা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কে সরকারীভাবে সফর করে গিয়েছেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট এবং তুরস্কের সাথে ইসরাইলের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আর যেকোন সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশী।

২) উইঘুর মুসলিম এবং চীনঃ
চীন সরকার কর্তৃক উইঘুর মুসলিমদের উপর নির্যাতন নিয়ে এরদোয়ানের অবস্থা একই। তাদের বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠে নির্বাচনী সভায় বক্তব্য দিয়ে জনগণের সহানুভূতি আদায় করেছিলেন এরদোয়ান।
বাস্তবতা হচ্ছে, চীন সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান উইঘুর মুসলিমদের নিয়ে কোন টু শব্দও করেন নি। এমনকি অনেক উইঘুর মুসলিম নেতাদের উপর তুরস্ক সরকার নজরদারী করছে।

৩) চেচনিয়ার মুজাহিদ এবং রাশিয়াঃ
রাশিয়ার সাথে তুরস্কের সম্পর্ক নিয়ে বলার কিছু নেই। রাশিয়ার পুতিনের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য ২০০৪-০৭ সালের দিকে পুতিনের হাতে চেচনিয়ার মুজাহিদদেরকে তুলে দিয়েছিল এরদোয়ান সরকার। ২০০০ সালের দিকে পুতিনের আক্রমনে চেচনিয়ার অনেক মুজাহিদ তুরস্কে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন ইসলামী আন্দোলনের সহায়তায়।
কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজনে রাশিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়নের খাতিরে এরদোয়ান তাদেরকে হস্তান্তর করেন পুতিনের নিকট।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সে সময় এরদোয়ানের এই পদক্ষেপকে ভিন্ন দেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতারা অনেকেই হিকমত হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন।

৪) জামায়াতের নেতৃবৃন্দ এবং বাংলাদেশঃ
বাংলাদেশ জামায়াতের নেতৃবৃন্দকে এরদোয়ানের একটি জ্বালাময়ী ভাষণ রয়েছে। যা বাংলা ভাষায় সাবটাইটেল দিয়ে ব্যপক প্রচারিত হয়েছিল। এরদোয়ান একটি নির্বাচনী জনসভায় এই ভাষন দিয়েছিলেন ২০১৬ সালে মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসিকে কেন্দ্র করে। যা বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় জনতাকে আবেগাপ্লুত করেছিল।
বাস্তবতা হচ্ছে তুরস্ক সরকার বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দলের সাথে সব ধরনের সম্পর্ক পুর্বের যেকোন সময়ের তুলনায় ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি করেছে।
কেননা বর্তমানে বাংলাদেশ হচ্ছে তুরস্কের ব্যবসার অন্যতম একটি জায়গা। বাংলাদেশের মানুষের তুরস্কের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে, মুসলিম হওয়ার কারনে সেই আবেগের জায়গা থেকে তুরস্কের পণ্যের প্রতি আগ্রহ প্রবল যা অতি স্বাভাবিকভাবেই ত্বরান্বিত করেছে ব্যবসার ক্ষেত্রকে।


মোদ্দাকথা, বৈদেশিক নীতি এক জায়গায় এবং অভ্যন্তরীন কৌশল এক জায়গায়। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ভোটের আদায়ের জন্য অনেক কথা বলে থাকেন। তার এসকল বক্তব্যকে দেশটির অভ্যন্তরীন রাজনীতির একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উত্তম। সরকারী দলকে একদিকে ভোট আদায় করতে হয় অপরদিকে বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলতে হয়। আর একটি দেশের অর্থনীতির চাকা যখন প্রায় অচলাবস্থার সম্মুখীন তখন রাষ্ট্র কোন সংগঠনকে দুই পয়সার যে দাম দিবে না তা অতি বাস্তবতা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই ধরেন, মুসলিমদের এত নির্যাতন ভারতে প্রত্যক্ষ করার পরও ইসলামপন্থী কোন দল সরকারে যদি থাকত, তবে অভ্যন্তরীনভাবে জনগণের ভোটের খাতিরে অনেক জ্বালাময়ী ভাষণ দিতে দেখা যেত। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ঠিকই ভারতকে সব ধরণের সুযোগ দিতে বাধ্য হত।

সোজাকথায়, প্র্যাগমেটি রাজনীতিতে আবেগ ও আদর্শের কোন ঠাই নেই। তাই ইখওয়ানের প্রতি এরদোয়ানের এসকল পদক্ষেপকে আবেগ দিয়ে দেখার ফায়দা নেই। এরদোয়ান নিজেই বলেন তিনি সেক্যুলার নেতা। তার কাছে তার ক্ষমতা সকল কিছুর উর্ধ্বে। বাস্তবতা ও আবেগ কখনই এক পাল্লায় চলে না।

পঠিত : ৬১৩ বার

মন্তব্য: ০