Alapon

আল্লামা সাঈদী : ইতিহাসের কিংবদন্তী


আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী একটি নাম, একটি ইতিহাস। বাংলাদেশের ইতিহাসের কিংবদন্তি। এ ধরনের ক্ষণজন্মা মানুষ পৃথিবীতে ক্ষণে ক্ষণে আসে না। কাল এবং শতাব্দীর গণ্ডি পেরিয়ে এমন বিরল প্রতিভা আর তেজস্বী ব্যক্তির আবির্ভাব হয়। পৃথিবীর অগণন মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় যার অবস্থান। বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু নয়, এ উপমহাদেশের ইতিহাসে এমন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব গত শতাব্দী এবং এই শতাব্দীতে দেখা যায় না। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ছিলেন, কিন্তু তিনি যতটা একটি সংগঠনের নেতা তার চেয়ে বেশি তিনি পরিচিত একজন আলেমে দীন ও তাফসীরকারক হিসেবে। দল মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণি পেশার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন হৃদয়ের আপনজন। মানুষকে আল্লাহর দীনের পথে আহ্বানের ক্ষেত্রে তিনি একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আল কুরআনকে স্বচ্ছ, সুন্দর সাবলীল ভাষায় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তিনি অন্য সবার চেয়ে ব্যতিক্রম। মানুষের বোঝার মতো করে আকর্ষণীয় ভাষায় কুরআনকে উপস্থাপনের যে দক্ষতা আল্লাহ তাঁকে দান করেছিলেন, তা বর্তমান সময়ে অন্য কারো মধ্যে দেখা যায় না। তিনি এ দেশের সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। তার সুরেলা কণ্ঠ জনতাকে টানতো অতি আপন করে। সুন্দর সুরলহরী আর উপস্থাপনার শৈল্পিক রূপ মানুষের হৃদয়ে ছুয়ে যেত। মোহণীয় ভাষায় বক্তব্যের উপস্থাপনা আর কুরআনের তেলাওয়াত মানুষকে পঙ্গপালের মতো টানতো। শত জুলুম নির্যাতন, বাধা প্রতিবন্ধকতা, অপপ্রচার আর দাবিয়ে রাখার নানামূখী প্রচেষ্টা সত্বেও তার নাম মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতেও সম্ভব হবে না। তিনি এখন আল্লাহর জিম্মায়। পৃথিবীর সকল বন্ধন ছিন্ন করে তিনি চলে গেছেন মহান রবের সান্নিধ্যে। কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা আর দোয়া নিয়ে তিনি এখন ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া থেকে চিরস্থায়ী জীবনের পথে।
যার গোটা জীবন কুরআনের আহ্বান আর মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন তাঁকে শতাব্দীর ভয়াবহতম মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে দীর্ঘ তেরো বছর কারা প্রকোষ্ঠে রেখে নির্যাতনের যে নজির উপস্থাপন করা হয়েছে তা জাতি ভুলবে না। ন্যাক্কারজনক ও জঘন্য মিথ্যাচারের খোলস জনগণের সামনে উম্মুক্ত হয়ে গিয়েছে। ইসলামপ্রিয়, গণতন্ত্রপ্রিয়, শান্তিকামী মানুষ এ সকল মিথ্যাচারকে শুধু স্মরণেই রাখবে না, তারা আগামী দিনে এ সকল মিথ্যাচারের প্রতিকার অবশ্যই করবে। মানবতার কল্যাণ ছিল যার জীবনের ব্রত, তাঁর বিদায়ে সরকারী তরফে যে ন্যাক্কারজনক আচরণ করা হয়েছে এটা দেশবাসী কখনো কামণা করেনি। সরকারের আচরণ ইতিবাচক হলে মাওলানার মৃত্যু নিয়ে আজ যত কথা ডালপালা মেলছে তা হবার সূযোগ ছিলো না। বাতাসে অনেক কথা ভেসে বেড়াচ্ছে, যার সঠিক বিষয়গুলো হয়তো আগামীতে সামনে আসবে। মৃত্যুকালীন সময়ে মাওলানার যতটুকু সেবা পাওয়ার দরকার ছিলো এবং মৃত্যুর পরে জনগণের দাবী অনুযায়ী সুষ্ঠুভাবে তাঁর জানাজা যেভাবে নির্বিঘ্ন হওয়ার দাবী ছিলো, এটা হলে এত কথা ডালপালা মেলার সূযোগ পেতো না। যারা এত বড়ো আলেমের সাথে তার জীবদ্ধশায় এবং মৃত্যুর পরে ভালো আচরণ করেনি, তারা যুগ যুগ ধরে জনগণের কাছে বিবেকের কাঠগড়ায় আসামী হিসেবে দণ্ডায়মান থাকবে। যারা সামান্য জানাজা নামাজ পর্যন্ত পড়তে না দিয়ে হীনমন্যতা আর জুলুম নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছে তারা শুধু জনগণের ঘৃণাই কুড়াবে। আল্লামা সাঈদী যুগের পর যুগ মানুষের মনের মনিকোঠায় উজ্জল ভাস্বর হয়ে থাকবেন ইনশাআল্লাহ।
কুরআনের আহ্বান পৌঁছে দেয়া ছিলো যার জীবনের একমাত্র ব্রত : আন্তর্জাতিক খ্যতিসম্পন্ন আলেমে দীন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী গোটা দুনিয়ার দেশে দেশে যেভাবে পরিচিত বাংলাদেশের আলেম সমাজের মধ্যে বর্তমানে তার মতো এতো বেশি আর কেউ পরিচিত নন। তার এই পরিচিতির পেছনে শুধু একটি বিষয় নেয়ামক হিসেবে কাজ করেছে, তা হলো তিনি কুরআনের আহ্বান মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। মাওলানার পিতা ইউসুফ সাঈদীর স্বপ্ন ছিলো নিজের সন্তানকে আলেম বানাবেন। পিতার আকাক্সক্ষা আর স্বীয় অদম্য আগ্রহ তাঁকে কুরআনের জ্ঞান অর্জনে ব্রতী করে তোলে। তিনি কুরআনকে নিজের জীবনের সাথে একাকার করে নিয়েছিলেন। তাঁর জীবনের মিশনই ছিলো তাফসীর মাহফিলের মাধ্যমে কুরআনের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। তিনি তাঁর জীবনে তাফসীর মাহফিল শুরু করেছিলেন ক্ষুদ্র পরিসরে। আধুনিক যুগের বর্তমান যে সকল মাধ্যম এর কোনো কিছুই মাওলানার তাফসীর মাহফিল শুরুর প্রাক্কালে ছিলো না। কিন্ত মাওলানা সাঈদীর জীবনের ব্রত যেহেতু ছিলো কুরআনকে মানুষের বোধগম্য ভাষায়, মানুষের আমলের উপযোগী করে উপস্থাপন করা। এ কাজটি করে গেছেন তিনি আজীবন। কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে থেকেও মাওলানার স্বপ্ন ছিলো, আকাক্সক্ষা ছিলো যে তিনি আবার কুরআনের ময়দানে ফিরে আসবেন এবং তাফসীর মাহফিলে বক্তব্য রাখবেন। কুরআনের বাণী মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেয়ার অদম্য ইচ্ছা, আগ্রহ আকাক্সক্ষা আর হৃদয়ে লালিত স্বপ্নকে ধারণ করেই তিনি কারাগারের দিনগুলো অতিাবহিত করেছেন। সেখানেও তার একটিই কাজ ছিল কুরআন অধ্যয়ন, অনুশীলন আর কুরআনের আলোকে নিজের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যকে আরো বেশি সুন্দর করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। কুরআনের বাণীকে ছড়িয়ে দেয়ার অদম্য ইচ্ছাকে ধারণ করেই তিনি কারাপ্রকোষ্ঠে বসে রচনা করেছেনআল কুরআনের একটি সহজ অনুবাদ। যে জীবন কুরআনের আলোয় আলোকিত সে জীবন তো স্বাভাবিকভাবে বয়ে চলে না। তাই তিনি সময়ের সঠিক ব্যবহারের জন্য এই অনবদ্য গ্রন্থ রচনার মতো মহতি কাজটি কারাগারে বসেই করেছেন।

তাফসীর মাহফিলের ব্যতিক্রমী ধারার প্রবর্তক : বর্তমানে বাংলাদেশে তাফসীর মাহফিলের ব্যাপক প্রচলন এর যে শৈল্পিক রূপ তার পথচলা শুরু হয়েছে আল্লামা সাঈদীর মাধ্যমে। কুরআনকে মানুষের কাছে হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপনের যে কাব্যিক ব্যঞ্জনা তা তিনিই প্রথম জনগণের সামনে নিয়ে এসেছেন। শব্দ সংষ্কৃতির আধুনিক রূপায়নের মাধ্যমে কুরআনকে মানুষের কাছে অতি সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপনের আধুনিক সাংষ্কৃতিক ধারার প্রবর্তন আল্লামা সাঈদীর হাত ধরেই। ওয়াজের ময়দানে আধুুনিক যুক্তি জ্ঞান এবং বিজ্ঞানের সমম্বিত ভাষায় কুরআনকে উপস্থাপনের সূচনা তার হাত ধরেই। আধুনিক জাহেলিয়াতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসলামের বৈপ্লবিক বক্তব্যকে সাহসী উচ্চারণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার কাজটি তিনি প্রথম করেছেন। এখন আমাদের দেশের আনাচে কানাচে অসংখ্য তাফসীর মাহফিল হচ্ছে, শুধ্ ুদেশেই নয় দেশের বাইরেও অসংখ্য তাফসীর মাহফিল হচ্ছে, এর সূচনা বিন্দুর একক কৃতিত্ব একমাত্র আল্লামা সাঈদীরই প্রাপ্য। স্বাধীনতার পর পর আশির দশকের শুরুতে তিনি ইউরোপ আমেরিকায় তাফসীর মাহফিল উপলক্ষ্যে সফর শুরু করেন। আল্লামা সাঈদী যখন তাফসীর মাহফিলের মাধ্যমে দীনের দাওয়াতের কাজ শুরু করেন তখন বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে ঈসালে সাওয়াব মাহফিলের প্রচলন ছিলো। অধিকাংশ মাহফিলগুলো হতো গ্রামে। সমাজের ধার্মিক লোকদের প্রচেষ্টায় এ মাহফিলগুলোর আয়োজন হতো। ক্ষেত্র বিশেষে বিভিন্ন দরগাহের পীর সাহেবরা এক এক জেলায় যেতেন এবং সেখানে মাহফিলের আয়োজন হতো। বিশেষ করে ভারতের ফুরফুরা, জৈনপুর থেকে পীর সাহেবরা আসতেন। বাংলাদেশে তখন শর্ষীণা, বায়তুশ শরফ, আড়াইবাড়ী, চরমোনাই পীর সাহেবরা বিভিন্ন এলাকায় মাহফিল করতে যেতেন। তখনকার সময়ে পোষ্টারের ভাষাও ছিলো, সেই আঙ্গিকে। পোষ্টারে লেখা থাকতো ..... পীর সাহেবের আগমণ উপলক্ষ্যে বিশাল ওয়াজ ও দোয়ার মাহফিল কিংবা ..... উপলক্ষ্যে ঈসালে সাওয়াব মাহফিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ সকল মাহফিলে কিছু ওজিফা, দোয়া কালাম শিক্ষা দেয়া এবং অতীতের নবী-রাসূল ও আউলিয়াদের কারামত সংক্রান্ত বয়ান করা হতো। বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে ঐ সকল আলেম, পীর-মাশায়েখের অবদান অনস্বীকার্য, তবে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মাধ্যমে এ ধারার ব্যাপক পরিবর্তন আসে। যদিও ওনার আগে এবং সমসাময়িক কালে আরো বেশ কয়েকজন বড়ো মাপের আলেম আধুনিক ধারার তাফসীর মাহফিল শুরু করেছিলেন। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাওলানা লুৎফুর রহমান, মাওলানা মোহাদ মাসুম, মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী, মাওলানা কামাল উদ্দিন জাফরী প্রমূখ। তাদের সকলকে ছাপিয়ে আল্লামা সাঈদী অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন দীনি দাওয়াতের এ ময়দানকে।
কুরআনের আয়াত দিয়ে তাফসীর মাহফিল শুরু করা। শুরুতে যে আয়াত তেলাওয়াত করা হয়। সেই আয়াতের ব্যাখ্যায় কুরআনের অন্যান্য স্থানে আর কি কি আয়াত আছে তা তুলে ধরা। এ সকল আয়াতের ব্যাখ্যায় হাদীস এবং সাহাবীদের জীবন থেকে কি কি শিক্ষা আছে তা তুলে ধরা এবং এর শিক্ষা কী- তা তুলে ধরার যে পদ্ধতি তা মূলত এই জনপদের মানুষেরা আল্লামা সাঈদীর ওয়াজের মাধ্যমেই নতুনভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছে। এ সকল কারণে আল্লামা সাঈদীর মাহফিলে মানুষ পঙ্গপালের মতো ছুটে আসতো। তার ওয়াজ শোনার জন্য মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো। বর্তমানে বাংলাদেশের শহরে, নগরে, বন্দরে অসংখ্য তাফসীর মাহফিল হচ্ছে। অনেক নতুন নতুন আলোচক তৈরী হয়েছে। কুরআনের তাফসীর মাহফিলের এই ব্যাপকতায় তাঁর অনন্য অবদান অন্য সকলের শীর্ষেই শুধু নয় বরং সকলের যে অবদান তার সমান অবদান আল্লামা সাঈদীর।
তাফসীর মাহফিলের নতুন ডাইমেনশন : তাফসীর মাহফিলের অডিও এবং ভিডিও ধারণ করে তা সংরক্ষণ ও বাজারজাত করার মাধ্যমে অগণিত মানুষের কাছে এই বক্তব্য ছড়িয়ে দেয়ার কাজটি আল্লামা সাঈদীর মাহফিলের মাধ্যমে শুরু হয়। এ কাজ প্রথম শুরু করে চট্টগ্রামের ইসলামী সমাজকল্যাণ পরিষদ এবং ঢাকার সি এইচ পি। এ ছাড়াও বগুড়া এবং খুলনার দুটি প্রতিষ্ঠান আল্লামা সাঈদীর ওয়াজের বেশ কয়েকটি ক্যাসেট বাজারে এনেছিলো। তবে ব্যাপকভাবে আল্লামা সাঈদীর ক্যাসেট বাজারজাত করার কাজটি সি এইচ পিই বেশি করেছে। আমাদের জানামতে আল্লামা সাঈদীর তাফসীর মাহফিলের ক্যাসেট রেকর্ডিং ও বাজারজাত করার মাধ্যমে এ ধারার প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয়। তাফসীর মাহফিল ব্যাপকভাবে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার যে নতুন ডাইমেনশন তার সাথে মানুষ পরিচিত হয় আল্লামা সাঈদীর ওয়াজের মাধ্যমে। এর আগে আর কারো ওয়াজের ক্যাসেট বাজারজাত হওয়ার কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। অবশ্য এর পরবর্তীকালে বা সমসাময়িককালে অনেকের ওয়াজের ক্যাসেটই বাজারে পাওয়া যেত। কিন্তু আল্লামা সাঈদীর ক্যাসেটের মতো এত ব্যাপক প্রচার ও প্রসার আর কারো ওয়াজের ক্যাসেটের ছিলো না। তাঁর বক্তব্য ছিলো গোছালো, বিষয়ভিত্তিক, মার্জিত, আকর্ষণীয়, সুরেলা কণ্ঠ এবং আবেগময়ী ও আবেদনধর্মী। এ কারণে তাঁর ওয়াজ মানুষ বার বার শুনলেও মানুষের তৃপ্তি মিটতো না। আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষ করে কম্পিউটারের অবাধ ব্যবহার শুরু হবার পূর্বে এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফেসবুক ও ইউটিউব সহজলভ্য হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আল্লামা সাঈদীর ওয়াজের অডিও ক্যাসেট বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ প্রতিটি মুসলমানের ঘরে পাওয়া যেত।

বাস, লঞ্চ, হোটেল, দোকান সর্বত্রই আল্লামা সাঈদীর ওয়াজের ক্যাসেট বাজতো। আশি এবং নব্বইয়ের দশকে বিভিন্ন রেস্তোরা দোকানে আল্লামা সাঈদীর ওয়াজের ক্যাসেট বাজানো হতো আর মানুষ জরো হয়ে সে ওয়াজ শুনতো। গ্রামে গঞ্জে এমনকি শহরে অনেক বাড়িতে অনেক মানুষ একত্রে জরো হয়ে টেপ রেকর্ডারে আল্লামা সাঈদীর ওয়াজ শুনতো। দেশের নানা প্রান্তে মানুষ ভিডিও প্লেয়ারের মাধ্যমে আল্লামা সাঈদীর ওয়াজ শুনতো। এ ধরনের অনুষ্ঠানে অসংখ্য মানুষ উপস্থিত হয়ে তাঁর ওয়াজ শুনতো। নব্বই দশকের শেষের দিকে অর্থাৎ ১৯৮৭-৮৯ সাল পর্যন্ত আল্লামা সাঈদীর ওয়াজ যাতে মানুষ শুনতে না পারে এ জন্য ইসলাম বিরোধী একটি গোষ্ঠী ব্যাপক বাধা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তারা সভা সমাবেশ ও মিছিল করার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে হুমকি দিতে থাকে যাতে মানুষ তাঁর ওয়াজের ক্যাসেট না বাজায়। সেই সময়ে আমি কৈশোর পার করছি। তখন পর্যন্ত আল্লামা সাঈদীকে সরাসরি দেখার সূযোগ হয়নি। আমার কৈশোর কেটেছে দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলা শহরে। শহরের যে কয়টি বড় রেস্তোরা ছিলো সেখানে প্রতিদিন সকাল বেলা টেপ রেকর্ডারের মাধ্যমে বড় সাউণ্ড বক্স দিয়ে আল্লামা সাঈদীর ওয়াজ বাজানো হতো। প্রতিদিন সকালে এ সকল রেস্তোরার সামনে বিপুল সংখ্যক মানুষ তাঁর ওয়াজ শোনার জন্য জড়ো হতো। তখন দেখেছি লেনিন এবং কালমার্কস এর দর্শনের ধারক দলটির নেতারা সেই সব হোটেলগুলোতে গিয়ে হুমকি ধমকি দিতো সাঈদীর ওয়াজ না বাজানোর জন্য, কিন্তু এরপরও মানুষ নিয়মিত আল্লামা সাঈদীর ওয়াজ বাজাতো এবং শুনতো।
বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করতেন : প্রচলিত ধারার ওয়াজের ব্যতিক্রম হিসেবে তিনি সব সময়ে বিষয় ভিত্তিক আলোচনা করতেন। মানুষের জীবনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত যত বিষয় আছে, সমাজ জীবনে যতগুলো বিষয়ের সাথে মানুষকে সম্পৃক্ত হতে হয়, রাষ্ট্রীয় জীবনে যে বিষয়গুলো মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে- সকল বিষয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। তার আলোচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো হচ্ছে : তাওহীদ, রেসালাত, আখিরাত, খেলাফত, শির্ক, বিদআত, সামাজিক কুসংস্কার,পিতা-মাতার অধিকার, সন্তানের প্রতি পিতার দায়িত্ব, প্রতিবেশীর অধিকার, আত্মীয় স্বজনের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য, ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ্জ, কুরবানী, যাকাত, সূদ, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সম্পদের সুষ্ঠু বন্টন, জিহাদ, ঘুষ,দূর্নীতি, যৌতুক, অপচয়, অপব্যয়, কমিউনিজম, সেক্যুলারিজম, চুরি- ডাকাতির শাস্তি, সমাজে ফিতনা ফাসাদ হানাহানির পরিণতি, আধিপত্যবাদের ষড়যন্ত্র-ইত্যাদি শতাধিক বিষয়ে তিনি আলোচনা করেছেন। যখন যে বিষয়টি প্রসাঙ্গিক তখন তিনি সেই বিষয়টি আলোচনা করতেন। আলোচনা করতে গিয়ে সরকার অথবা রাষ্ট্র তার প্রতি বিরাগভাজন হবে কি না, এ কথা কখনো তাকে তাঁর নির্দিষ্টি আলোচনা থেকে ফেরাতে পারেনি। বর্তমানে যারা তাফসীর মাহফিলের মাধ্যমে দীনের দাওয়াতের কাজ করছেন, তাদের বেশ কয়েকজন এমন মন্তব্য করেছেন যে, ‘আমরা যে কোনো বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করার আগে আল্লামা সাঈদী এই বিষয়ে কি বলেছেন, সেই ওয়াজগুলো শুনে নেই।’ তাফসীর মাহফিলে ব্যতিক্রমী ধারার প্রবর্তনে এটি মাওলানার এক অনন্য অবদান। তিনি তাফসীরের ক্ষেত্রে অন্য যে ধারাটি অবলম্বন করতেন, তা হচ্ছে : কুরআনের কোনো নির্দিষ্ট সূরা থেকে তাফসীর শুরু করতেন। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, বগুড়া, সিলেট, খুলনা এ সকল স্থানে প্রতি বছর তার নির্দিষ্ট তাফসীর প্রোগ্রাম থাকতো। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পারেড ময়দানে তিনি একাধারে তাফসীর করেছেন তিন যুগের বেশি সময় ধরে। এ সকল মাহফিলে তিনি কুরআনের একটি সূরা দিয়ে শুরু করতেন এবং পরবর্তী বছর তার পরের সূরায় চলে যেতেন। তাফসীর মাহফিল করার ক্ষেত্রে আল্লামা সাঈদীর মতো এমন ধারাবাহিকতা আর কেউ রক্ষা করতে পারেনি। একইভাবে এক মঞ্চে একাধারে যুগের পর যুগ দুই, তিন, পাঁচ দিনব্যাপী মাহফিল করার মতো এমন ধারাবাহিকতা এবং নিজের ব্যক্তিত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে পারেনি।
কমিউনিজমের উত্তাল সয়লাব মোকাবিলা: এই উপমহাদেশে কমিউনিজমের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করে ষাটের দশক থেকে। পৃথিবীর সকল আলেম ও ইসলামী স্কলারগণ একমত যে কমিউনিজম একটি নাস্তিক্যবাদী-ঈমান বিধ্বংসী দর্শন। পৃথিবীর যে সকল দেশে কমিউনিজম রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে পেরেছে তাদের প্রধান টার্গেট হয়েছে ইসলাম ও মুসলমান। আমরা যদি রাশিয়ার দিকে তাকাই তবে দেখতে পাই সোভিয়েত ইউনিয়নের গর্ভে হারিয়ে যায় কুড়িটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র। অথচ তাসখন্দ, বোখারা, আজারবাইজান সবই ছিলো ইসলামী জ্ঞান গবেষণার পাদপীঠ। কুরআনের পরে যে কিতাবটির গ্রহণযোগ্যতা মুসলিম বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সেই সহীহ আল বুখারীর সংকলক ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারীর জন্মস্থান এই রাশান অঞ্চলে। সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিষ্ট বিপ্লবের পর কমপক্ষে বিশ লক্ষ মুসলমানকে বিপ্লবের বলি হতে হয়েছে। ধর্মীয় সকল আচার অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। সকল দীনি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মসজিদগুলো অনাবাদী হয়ে গিয়েছে। অনেক মসজিদকে পানশালায় পরিণত করা হয়েছে। মুসলিম যুবকরা স্বীয় ধর্মীয় পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করতে থাকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর যখন মুসলিম রাষ্ট্রগুলো স্বাধীন হতে থাকে তখন সেখানকার বিভৎস চিত্র জনসম্মুখে আসতে শুরু করে। এর আগে সেখানকার অভ্যন্তরীণ কোনো সংবাদ বাইরে আসার সূযোগ ছিলো না। সোভিয়েত বিপ্লবের পর এর ধাক্কা লাগে গোটা দুনিয়ায়। এই উপমহাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। ষাটের দশক হতে কমিউনিজমের প্রবল বাতাস প্রবাহিত হতে থাকে আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে। সামান্য ব্যতিক্রম বাদ দিলে বেশিরভাগ মেধাবী ছাত্ররা কমিউনিজমের চটকদার শ্লোগাণের আকর্ষণে ঐ দিকে ভিড়তে থাকে। একই সাথে শ্রমিক শ্রেণির একটি বড় অংশ যাদেরকে বোঝানো হয়েছে, কেউ থাকবে গাছ তলায় আর কেউ থাকবে দশ তলায় তা হবে না। শ্রমিক রাজ কায়েমের শ্লোগাণের মোড়কে তাদেরকে ঐ দিকে ধাবিত করে। মূলত ¯্রষ্টা এবং ধর্মের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেই কমিউনিজমের জন্ম। তরুণরা কমিউনিস্ট রাজনীতির সাথে মিশে ইসলাম বিদ্বেশী হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে। দিকভ্রান্ত তরুণ সমাজকে হৃদয়গ্রাহী ভাষায় মাওলানা তার মাহফিলের মাধ্যমে ইসলামের পথে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। মাহফিলগুলোতে মাওলানা সাঈদীর মতো আর কেউ কমিউনিজমের অসাড়তা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেনি। তিনি একদিকে তরুণদেরকে ইসলামের পথে আহ্বান জানিয়েছেন অপর দিকে কমিউনিজমের প্রবল বাত্যাবহকে মোকাবিলা করেছেন। যার কারণে এ দেশে যারা কমিউনিস্ট রাজনীতির ধারক ও বাহক তারা আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে ছিলেন প্রচণ্ড রকম বিদ্বেষপরায়ণ। তারা মাহফিলস্থলে হরতাল আহ্বান করা, পাল্টা সমাবেশ আহ্বান করা, বোমা হামলা করা, গুলি চালানো হেন কোনো কাজ নেই যা তারা করেনি। একদিকে তাদের পরিচালিত পত্র-পত্রিকায় মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে নানামূখী অপপ্রচার, কুৎসা রটনা, সভা সমাবেশে মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা গালাগাল ও বক্তব্য প্রদান অপরদিকে হামলা ভাঙচুরের মতো কাজ তারা করতো। কিন্তু সচেতন তরুণ ও যুবকরা পঙ্গপালের মতো আল্লামা সাঈদীর মাহফিলে শরীক হয়ে তারা প্রমাণ করেছে, ইসলামই মানবতার মুক্তির একমাত্র পথ।
তরুণ যুবকরা ছিলো তাঁর মাহফিলের প্রধান আকর্ষণ : একটি সময় এমন ছিলো যে কিছু মধ্য বয়সী মানুষ ও বৃদ্ধ মানুষের ওয়াজ মাহফিলের শ্রোতা হিসেবে ওয়াজ মাহফিলে যেত। কারণ ঐ সকল মাহফিলে ধর্মীয় আলোচনা হলেও যুবকদেরকে আকৃষ্ট করার মতো কোনো বৈপ্লবিক আলোচনা সেখানে থাকতো না। মাওলানা সাঈদীর বক্তব্যে ছিলো অতুলনীয় সম্মোহনী শক্তি। তিনি তাঁর প্রতিটি মাহফিলে তরুণ ও যুবকদেরকে বিশেষভাবে আহ্বান জানাতেন। তাদের জন্য মায়াভরা দরদ নিয়ে বক্তব্য রাখতেন। ক্ষুরধার যুক্তি আর বৈপ্লবিক আহ্বান তাই তরুণ ও যুবকদেরকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করতো। মাহফিলের মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের পথে আহ্বান জানানোর প্রচেষ্টা এই জনপদে আবহমানকাল হতে চলে এসেছে। প্রচলিত ধারায় আল্লামা সাঈদী যে পরিবর্তনের সূচনা করেছেন- তা অন্য কেউ এখন পর্যন্ত পারেনি। আগামীতে কেউ এমনভাবে পারবে বলে কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। আজ আমরা তরুণ ও যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে ভাবছি। মাদক, সন্ত্রাস, অন্যায়, অনাচার, অসভ্যতা, মানবিকতহীন সমাজ বিরোধী কাজের ব্যাপ্তি দিন দিন বাড়ছে। এর কারণ তরুণদের নৈতিক চরিত্র গঠনে মূল উপাদান হচ্ছে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। আল কুরআনের ঘোষণা হচ্ছে, ‘তোমরা মানুষদেরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করো, উত্তম নসিহত ও হেকমতের সাহায্যে’। কুরআনের এই নির্দেশনার বাস্তব অনুসরণ তিনি করেছেন, তাঁর গোটা জীবনে। যুক্তি, জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, আবেগ আর অতুলনীয় সম্মোহনী শক্তির মাধ্যমে তাই তিনি তরুণ যুবকদেরকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করতে পেরেছেন।
শিরক বিদআত বিরোধী আন্দোলন : এ দেশে শিরক ও বিদআতের প্রচলন অতীতেও ছিলো বর্তমানেও আছে। একশ্রেণির সহজ সরল ধর্মপ্রাণ মানুষ না বুঝে বিভিন্ন ভন্ড পীর ফকীরের মাজারে গিয়ে শিরক বিদআতে লিপ্ত হতো। এমনকি রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিরাও এ সকল শিরক বিদআতকে প্রমোট করতো। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও ইসলামের মূল কনসেপ্ট না বোঝার কারণে এ সকল বিদআতী খানকায় ভিড় জমাতো। আল্লামা সাঈদী আশির দশকের শেষ দিকে এ সকল শিরক ও বিদআতের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তাঁর আন্দোলনের প্লাটফর্ম ছিলো তাফসীর মাহফিলের ময়দান। তাফসীরের মাহফিলে তিনি জনগণকে এ সকল শিরক ও বিদআতের বিরুদ্ধে সচেতন করার জন্য বক্তব্য দেন। তাঁর এ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে শিরকের ভয়াবহ সয়লাব অনেকাংশে কমে গেছে।
রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেই তিনি কথা বলতেন: আল্লামা সাঈদীর একটি বিখ্যাত উক্তি হচ্ছে, ‘বিড়ালের মতো একশত বেঁচে থাকার চেয়ে, সিংহের মতো এক ঘন্টা বেঁচে থাকা উত্তম’। বাতিলের নানামূখী ষড়যন্ত্র, মাহফিলে বার বার হামলা, জীবন নাশের নানাবিধ অপচেষ্টা, দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র সকল কিছু মোকাবিলা করেই তিনি তার জীবনের মিশন ও ভিশনের ওপর অটল অবিচল ছিলেন। অসংখ্যবার তাঁর মাহফিলে হামলা হয়েছে। মাহফিল বাঞ্চালের অপচেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু তিনি প্রতিটি মাহফিলে যাবার ব্যাপারে সব সময় দৃঢ় ছিলেন। হামলার ভয়ে বা কারো পক্ষ থেকে প্রাণ নাশের হুমকি দেয়া হয়েছে এ কারণে তিনি তার মাহফিলে যাওয়া থেকে বিরত থেকেছেন-এমন কোনো ঘটনা কখনো ঘটেনি।জীবনে বহুবার মৃত্যুর মূখোমুখি হয়েছেন কিন্তু দীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজ হতে কখনো পিছপা হন নি। সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা অসঙ্গতি নিয়ে সব সময় সোচ্চার ছিলেন, ইসলামের আলোকে এর সমাধান পেশ করতেন। আধিপত্যবাদ ও সাম্রজ্যবাদের ভয়ানক সব ছোবল থেকে দেশ জাতি ও রাষ্ট্রকে রক্ষায় তিনি সব সময় উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। আমাদের জাতিসত্ত্বার অস্তিত্ব রক্ষায় তিনি ছিলেন আপোষহীন। মাওলানাকে হত্যার জন্যও বেশ কয়েকবার ব্যর্থ হামলা চালানো হয়েছে কিন্তু তিনি দমে যাবার পাত্র ছিলেন না। রাজধানী ঢাকায় ১৯৯২ সালে এবং ১৯৯৬ সালে পান্থপথের মাহফিলে মুহুর্মুহু গুলি আর বোমা হামলা চালিয়েছিলো, চট্টগ্রামে একবার মাওলানার ওপর হামলা করেছিলো ইসলামের দুশমন গোষ্ঠী, কিন্তু তিনি অটল অনড় ছিলেন। এতো বড়ো হামলার পরেও তিনি মাহফিলের মঞ্চ ছাড়েন নি। ওয়াজ এবং তাফসীর মাহফিলের ময়দানে অনেকেই দীনের কাজ করছেন, কিন্তু মাওলানার মতো এমন বীরত্ব ও সাহসিকতা নিয়ে আর কেউ এগিয়ে এসেছে বলে কোনো নজির নেই। আগামী দিনে তাঁর মতো এমন সিংহ শার্দুল আসবে বলেও কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না।
সহ¯্রধিক অমুসলিম তার হাতে মুসলমান হয়েছেন : আল্লামা সাঈদী দেশে এবং দেশের বাইরে পঞ্চাশ বছর যাবৎ তাফসীর মাহফিল করেছেন। তিনি স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। কারো দান, দয়া বদান্যতা বা অনুগ্রহের কোনো প্রকার পরোয়া তিনি কখনো করেন নি। তিন একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করতেন, আল্লাহর কাছেই জীবন সপে দিয়েছিলেন, আল্লাহরই সাহায্যের মুখাপেক্ষী ছিলেন। বাংলাদেশে তার যে কয়টি নিয়মিত তাফসীর মাহফিল হতো তার চট্টগ্রামের পাঁচদিন ব্যাপী মাহফিলে তিনিই থাকতেন মূল আলোচক। এই মাহফিলে প্রতি বছর অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করতো। এ ছাড়াও দেশে এবং দেশের বাইরে অসংখ্য লোক তাঁর হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, যার সংখ্যা সহস্রাধিক।
অনাড়ম্বর জীবন যাপন : মাওলানা ছিলেন উন্নত আমলের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। জামায়াতে নামাজের ব্যাপারে নিজে যেমন সব সময় সচেতন থাকতেন, একইভাবে পরিবারের সদস্যসহ সকলকে এ বিষয়ে জোর তাগিদ দিতেন। জীবন যাপনে তিনি ছিলেন অনাড়ম্বর। নব্বইয়ের দশকে ঢাকার শাহজাহানপুরে একটি ছোটো ভবন করেছিলেন ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগে। আমাদের জানামতে ঢাকায় এর বাইরে তার কোনো সম্পদ নেই। গ্রামের বাড়ির দৃশ্য অনেকেই দেখেছেন। কাউকে হেয় করার জন্য নয়, বর্তমান সময়ে যারা ওয়াজ এবং তাফসীর মাহফিল করেন তাদের জীবন যাপন এবং চাহিদা সম্পর্কে মাঝে মাঝে যে এমন সব তথ্য আসে যা থেকে আল্লামা সাঈদী সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। তিনি যদি ইচ্ছা করতেন অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ার সূযোগ তার ছিলো কিন্তু তিনি সে পথ মাড়ান নি কখনো। তাঁর পোষাক পরিচ্ছদের কখনো জৌলুস কেউ দেখেনি। সব সময় বড় জোব্বা আর একটি কালো রুমাল তিনি ব্যবহার করতেন। নিজের পোষাক আষাকে কোনো বাহারী ঢং ছিলো না। মাহফিলের জন্য টাকার কন্টাক্ট করা, অগ্রিম টাকা গ্রহণ করা এবং আরো নানান কিসিমের যে সকল কথা বাজারে চাওর হয়ে আছে, এ সকল দোষত্রুটি হতে আল্লামা সাঈদী সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র ছিলেন। তাফসীর মাহফিলকে তিনি নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। জীবন যাপনেই শুধু স্বাভাবিক নয়, একটি রাজনৈতিক দলের সর্বোচ্চ সাড়ির নেতা হয়েও তার মধ্যে শিশু সূলভ সরলতা ছিল অতি স্বাভাবিক বিষয়। সাংগঠনিক দায়িত্বের কারণেই তিনি মাঝে মাঝে রাজনৈতিক সভা সমাবেশে বক্তব্য দিতেন, কিন্তু তিনি মূলত ওয়াজের ময়দানের লোক ছিলেন। তাফসীর মাহফিলের মাধ্যমেই তিনি তার ভূমিকাকে শতভাগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন।
অধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার : ইসলাম, ঈমান, দেশ ও জাতি বিরোধী যে কোনো ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় মাহফিলের স্টেজ থেকে আল্লামা সাঈদীর মতো এতো সাহসী উচ্চারণ আর কেউ এখন পর্যন্ত করতে পারেনি। আধিপত্যবাদ, আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ এবং দেশীয় রেজিমের বিরুদ্ধে আল্লামা সাঈদীর সাহসী উচ্চারণ জাতিকে নতুন স্বপ্ন বুনতে যুগে যুগে প্রেরণা যুগিয়ে যাবে। অন্যায়ের মোকাবিলায় সাহসী উচ্চারণে তার দৃঢ়তার ধারে কাছেও এখনো পর্যন্ত কেউ পৌঁছুতে পারেনি। আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জাতিকে সজাগ সচেতন করা। এর মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা পালনের জন্য জাতিকে উদ্বুদ্ধ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ যে মাহফিলের ময়দানে করা যায় তা সর্বপ্রথম আল্লামা সাঈদীই জাতির সামনে নিয়ে এসেছেন। দল মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মাঝে তাঁর যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এর এটাও একটি অন্যতম কারণ। সাংস্কৃতিক গোলামী, অর্থনৈতিক শোষন, জাতিগত নিপীড়ন সকল বিষয়ে তিনি বলিষ্ঠতার সাথে কথা বলেছেন। দেশীয় যে সকল রেজিমের বিরুদ্ধে আমাদের দেশের সাধারণ ওয়ায়েজগণ কথা বলতে সাহস করেন না। তিনি সেই সকল বিষয়ে কথা বলেছেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে। ঈমানের দাবী পূরণে সাহসী উচ্চারণের ক্ষেত্রে কোনো রক্তচক্ষু তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। সাহসের এক জলন্ত আগ্নেয়গিরি ছিলেন আল্লামা সাঈদী। দেশপ্রেমিক, ঈমানদার প্রতিটি মানুষ দৃঢ়তার সাথে এ কথা বিশ্বাস করেন যে, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আল্লামা সাঈদীর সাহসী ভূমিকার কারণেই তার ওপর এই জুলুম নির্যাতন চালানো হয়েছে। আধিপত্যবাদের সহায়ক দেশীয় রেজিমের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও খোলাখুলি উচ্চারণ আল্লামা সাঈদীকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। ঈমানের দাবী পূরণে তিনি এ আওয়াজ তোলা হতে কখনো পিছপা হননি।
অধ্যয়ন অনুশীলনে ছিলেন ব্যতিক্রমী : আল্লামা সাঈদী কুরআন বোঝা, জানা মানা এবং এর আলোকে জনগণের মাঝে পৌঁছে দেয়ার জন্য বাংলা ভাষায় রচিত ও অনুদিত তাফসীর হাদীস ও ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়নের পাশাপাশি সরসারি আরবী-উর্দূ কিতাব অধ্যয়ন করতেন। ভাসা-ভাসা জ্ঞান নিয়ে তিনি কোনো বিষয়ে বক্তব্য দিতেন না। তাঁর নিজস্ব সংগ্রহশালায় আছে দেশি বিদেশী কয়েক সহস্র কিতাব। আরবী উর্দূ কিতাবের পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় রচিত গ্রন্থও অধ্যয়ন করতেন। কোনো বিষয়ে বক্তব্য দেয়ার আগে সেই বিষয়ে যতটুকু সম্ভব বই সংগ্রহ করতেন তা অধ্যয়ন করে এরপর বক্তব্য দিতেন। সোস্যালিজম, কমিউনিজম, জায়োনজিম, পুজিবাদ ও আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে বক্তব্য দেয়ার আগে এ সকল বিষয়ে সাহিত্য ও জার্নালগুলো অধ্যয়ন করতেন। একই সাথে জাতীয় দৈনিকগুলো অধ্যয়ন করতেন। মূলত আশির দশকেই আল্লামা সাঈদী ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এ সময় তার মাহফিলগুলোতে একদিকে যেমন জনতার বাধভাঙা জোয়ার অপরদিকে ইসলাম বিদ্ধেশী মহলের উসকানিতে বেশ কিছু দৈনিক ও সাপ্তাহিক নিয়মিত তাঁর বিরুদ্ধে বানোয়াট ও মিথ্যা তথ্য প্রকাশ ও প্রচার করতো। সেই সময়ে বেশ কিছু সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিলো, যেমন : সাপ্তাহিক বিচিত্রা, সাপ্তাহিক সুগন্ধা, সাপ্তাহিক সূর্যোদয় ইত্যাদি। এ সকল পত্রিকা নিয়মিত ইসলামী ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে নানা ব্যঙ্গাত্মক কলাম লিখতো, কার্টুন প্রকাশ করতো। চরম ইসলাম বিদ্ধেশী পত্রিকাগুলোও উনি পড়তেন। এগুলো তিনি এ জন্য পড়তেন যে, আসলে তারা কি বলতে চাইছে এবং কোন ভাষায় বিরোধিতা করছে তা জানার জন্য।
ভাষা এবং শব্দ চয়নে ছিলেন পরিশীলিত : ওয়াজ মাহফিলের ময়দানে যতটুকু দু একটি গল্প বা কৌতুক তিনি মাঝে মাঝে হয়তো বলতেন। তবে তার ভাষা ছিলো পরিশীলিত, মার্জিত এবং রুচিসম্মত। যত আবেগী কথাই বলতেন তার একটি সীমা পরিসীমা তার ছিলো। অহেতুক কোনো তীর্যক কথা, অযাচিত কোনো বাক্য তিনি ব্যবহার করতেন না। তিনি বরিশাল অঞ্চলের লোক হওয়া সত্বেও উচ্চারণ এবং শব্দচয়নে আঞ্চলিকতা পরিহার করতেন। নব্বইয়ের দশকে একটি খ্যাতনামা সাপ্তাহিক মাওলানার সাক্ষাৎকার প্রচার করে। সেখানে অনেকগুলো প্রশ্নের মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিলো, আপনি তো বাংলা সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন না, আপনার শব্দচয়ন ও বাক্য ব্যবহারে ভাষার যে উৎকর্ষতা পরিলক্ষিত হয়, তা আপনি কিভাবে রপ্ত করেছেন। মাওলানা জবাব দিয়েছেন, (কোড-আনকোড) ‘আমি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, রেনেসার কবি ফররুখ আহমদের পাশাপাশি রবিন্দ্র সাহিত্য অধ্যয়ন করেছি, বঙ্কিমের লেখা পড়েছি, শরৎ চন্দ্রের লেখা পড়েছি। এ অধ্যয়নের মাধ্যমে আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে রপ্ত করার চেষ্টা করেছি’। তিনি তার বয়ানে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহ, দেশ, জাতিসত্বা ও মানবাধিকার পরিপন্থী যে কোনো বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানাতেন। ওয়াজে অহেতুক গল্প, অমার্জিত ভাষা ব্যবহার, নানান অঙ্গভঙ্গি, তীর্যক গালমন্দ ইত্যাদি থেকে তিনি নিজেকে পরহেজ করেছেন সব সময়।
সর্বাধিক দেশ সফরকারী : আন্তর্জাতিক পরিমল্ডলে বাংলাভাষী আলেমদের মধ্যে মাওলানা সাঈদীই প্রথম ব্যক্তি যিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দীনের দাওয়াতের জন্য সর্বাধিক দেশ সফর করেছেন। তিনি গ্রেট বৃটেন, আমেরিকা, আয়ারল্যাণ্ড, জার্মানী, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, সৌদী আরব, কাতার, কুয়েত, বাহারাইন, ইরান, সিরিয়াসহ পঞ্চাশেরও অধিক দেশ সফর করেছেন। এ সকল দেশে তিনি জন সাধারণের সামনে তাফসীর পেশ করেছেন। আল্লামা সাঈদী প্রতি বছরের একটি সময় বিদেশ সফরে থাকতেন। বিশেষ করে বাংলাদেশে যখন বর্ষাকাল এই সময়টাতে তিনি বিদেশে সফরে কাটাকেন এবং বিভিন্ন দেশে তাফসীর মাহফিলে বয়ান পেশ করতেন। বর্তমান সময়ে অনেকেরই নামের সাথে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন উপাধি লাগানো হয়। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন যদি বলতেই হয়, তবে তা একমাত্র আল্লামা সাঈদীর জন্যই প্রযোজ্য হতে পারে। এ সকল সফরে তিনি একদিকে যেমন বাংলাভাষী মুসলমানদের সামনে বক্তব্য দিয়েছেন আবার ঐ সকল দেশের মানুষদের সামনেও আলোচনা পেশ করেছেন।
বহু দেশে রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়েছেন : ১৯৭৬ সাল থেকে সৌদী সরকারের আমন্ত্রনে রাজকীয় মেহমান হিসেবে আল্লামা সাঈদী হজ্জ পালন করে আসছেন। ১৯৯০ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর রমজান মাস মক্কা মদীনায় থাকা তাঁর রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছিলো। এ সময় তিনি ওমরাহ পালন, ইবাদত বন্দেগী এবং কদাচিৎ কোনো সমাবেশে আলোচনা ও তাফসীর পেশ করতেন। ১৯৮২ সালে তিনি ইমাম খোমেনির আমন্ত্রনে ইরানের প্রথম বিপ্লব বার্ষিকী উপলক্ষে তেহরান সফর করেন । ১৯৯১ সালে সৌদি বাদশার আমন্ত্রনে কুয়েতে ইরাক যুদ্ধের মিমাংসা বৈঠকে তিনি যোগদান করেন । ১৯৯১ সালে ইসলামী সার্কেল অফ নর্থ অ্যামেরিকা তাকে “আল্লামা” খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৯৩ সালে নিউইয়র্কে জাতিসঙ্ঘের সামনে অ্যামেরিকান মুসলিম ডে প্যারেড সম্মেলনে মাওলানা সাঈদীকে “গ্র্যান্ডমাশার্ল’’ পদক দেয়া হয়। দুবাই সরকারের আমন্ত্রনে ২০০০ সালের ৮ই ডিসেম্বর আরব আমিরাতে ৫০,০০০ হাজারেরও বেশি শ্রোতার সামনে তিনি কুরআনের তাফসির পেশ করেন। লন্ডন মুসলিম সেন্টারের উদ্ভধনি অনুষ্ঠানে কাবা শরিফের সম্মানিত ইমাম “শায়েখ আব্দুর রাহমান আস সুদাইসির” সাথে মাওলানা সাঈদীও আমন্ত্রিত হন ।
দুনিয়ার জীবনের প্রতি ছিলেন লোভহীন : এত সন্মান এবং খ্যাতি সত্তে¡ও এই সন্মান মর্যাদাকে তিনি কখনো দুনিয়ার প্রতিপত্তি অর্জনে ব্যবহার করেন নি। আখিরাতের সফলতাই ছিলো তার জীবনের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য। তাঁর আচরণ, কর্ম এবং জীবন যাপন দুনিয়ার জৌলুস অর্জনের জন্য ছিলো না। অর্থবিত্ত আর প্রতিপত্তি অর্জনের চেষ্টায় রত থাকলে তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হতে পারতেন। আল্লামা সাঈদী তাঁর জীবনে যেই সন্মান, খ্যাতি আর মর্যাদা লাভ করেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের যারা দায়ী তারা কেউ তার কাছাকাছি পৌছুতে পারেন নি। আল্লামা সাঈদী এগুলোকে নিজের যোগ্যতা হিসেবে কখনো চিহ্নিত করেন নি। তিনি এ সবকে মহান আল্লাহর দান এবং কুরআনের মর্যাদা বলেই মনে করতেন। আমলে, কথা বার্তায়, চললে বলনে যেন আখিরাত বরবাদ হয়ে না যায় সে ব্যাপরে তিনি সজাগ ও সচেতন থাকতেন। তাঁর প্রতিটি মুনাজাতে মূখ্য বিষয় থাকতো কঠিন কিয়ামতের দিনে বিচারের মূখোমুখি হওয়ার ভয় এবং সেই ভয়াবহ অবস্থা থেকে। জাহান্নাম থেকে পানাহ চাওয়া এবং জান্নাত প্রাপ্তির তীব্র আকাক্সক্ষা আর আকুতি ঝড়ে পড়তো দোয়ার ভাষায়।
বিনয়ী ও নিরহংকার : আল্লামা সাঈদীর চরিত্রের অন্যতম একটি বিষয় ছিলো তার বিনয়। তিনি তার বিভিন্ন বক্তৃতায় সব সময় বলতেন, তাঁর মাহফিলে যে জনস্রোত, এটা সাঈদীর প্রতি ভালোবাসার জন্য এটা আল কুরআনের প্রতি ভালোবাসা। সাধারণ বিখ্যাত ব্যক্তিদের মধ্যে যে আত্ম-অহংকার, আত্ম-গরিমা ও গর্ব তৈরী হয় মাওলানা তা থেকে সব সময় নিজেকে মুক্ত রাখারা চেষ্টা করেছেন। মানুষের সাথে আচরণে কথা বার্তায় সব সময় তিনি এই বিনয়কে ধারণ করতেন। কেউ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ প্রার্থী হলে এ জন্য কোনো প্রটোকল অবলম্বন করতে হতো না। তিনি তার নিজের সম্পর্কে যে শব্দগুলো ব্যবহার করতেন তা হচ্ছে ‘কুরআনের একজন নগন্য ছাত্র’- তাঁর জীবনে কখনো তিনি নিজেকে তাফসীরকারক হিসেবে প্রকাশ ও প্রচার করেন নি। তিনি নিজের সম্পর্কে বলতেন ‘আল্লাহর আদনা গোলাম’ ‘ভাঙ্গাচোরা- নগন্য লোক’। আমার অনেক জনপ্রিয়তা আছে, আমি বাংলাদেশের সেরা তাফসীরকার এই ধরনের কোনো অভিব্যক্তি তার আচরণ, কথা বার্তায় কিংবা বক্তৃতায় কখনো প্রকাশ পায়নি। দীনের প্রয়োজনে কারো সাথে সাক্ষাৎ করতে যেতে তিনি কখনো কুণ্ঠাবোধ করেন নি। আমি বিশাল ব্যক্তিত্তে¡র অধিকার আমি কেন তার কাছে যাবো? এ ধরনের কোনো আচরণ তিনি কখনো প্রকাশ করেন নি। এই বিনয় ও অহংকারশূন্য আচরণ আল্লামা সাঈদীকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। তিনি নিজেকে অন্য সবার চেয়ে ক্ষুদ্র মনে করার কারণে তাঁর মর্যাদা কমেনি বরং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে অত্যুচ্চ মর্যাদা ও সন্মান দান করেছেন। আজ যারা হীনমন্যতা, কুপমÐকতা আর হিংসার কারণে আল্লামা সাঈদীর বিরোধিতা করছে- তারা কেউ আল্লামা সাঈদীর এই সন্মান মর্যাদার ধারে কাছেও পৌছুতে পারবে না।
ইসলামী ঐক্য প্রচেষ্টা : মাওলানা সাঈদী সব সময় এ দেশের সকল আলেম, ইসলামী দল ও ইসলামপন্থী ব্যক্তিদের মধ্যে ঐক্যের স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর এই স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা শুধু মৌখিক ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। বাংলাদেশের অধিকাংশ খানকা, পীর সাহেবের দরবার এবং বড়ো বড়ো মাদরাসাগুলোতে বার বার গিয়েছেন। তাঁদের সাথে সাক্ষা’ করেছেন, ইসলামী ঐক্যের জন্য বৈঠক করেছেন। সকলের কাছে নিজেকে অতি নগন্য ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরে তাদের সবাইকে সন্মান ও মর্যাদা দিয়ে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের একজন প্রাজ্ঞ ইসলামী চিন্তাবিদ ও রাজনীতিকের পরামর্শে আল্লামা সাঈদী আশির দশকের শুরু থেকেই ঐক্য প্রচেষ্টাকে কার্যকর রূপ দানের জন্য কাজ করেন। আল্লামা সাঈদী ঐক্য প্রচেষ্টার অতীত বর্ণনা করতে গিয়ে একটি ঘরোয়া আলাপে অতীত স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বলেছেন-(কোড আনকোড)১৯৭৬ সালে হজ্জ করতে গিয়ে বাংলাদেশের একজন ইসলামী ব্যক্তিত্ব যিনি তখন রাজনৈতিক বাঁধার কারণে লণ্ডনে অবস্থান করছিলেন, তার সাথে সাক্ষাৎ হয়। তিনি আল্লামা সাঈদীকে ইসলামী ঐক্যের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করেন এবং কাবার চত্বরে তাঁকে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। আল্লামা সাঈদী আগে থেকেই ইসলামী ঐক্যের আকাক্সক্ষা পোষণ করতেন। এরপর থেকে এ ঐক্যকে কার্যকর রূপ দেয়ার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে কাজ করেন। দেশের পরিচিত সকল আলেম ও ইসলামী ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ জন্য বার বার বৈঠক করেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গঠিত হয় ইত্তেহাদুল উম্মাহ বাংলাদেশ। ইত্তেহাদুল উম্মাহর উদ্যোগে সারা দেশে তিনি অনেকগুলো বড় বড় সমাবেশ করেন। তাফসীর মাহফিলগুলোতে এর উদ্দেশ্য লক্ষ্য তুলে ধরেন। কিন্তু নানা কারণে ইত্তেহাদুল উম্মাহ তাঁর সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। ইত্তেহাদুল উম্মাহর স্থায়িত্ব টিকে না থাকার পেছনে আল্লামা সাঈদীর কোনো দূর্বলতা বা ছিলো না বরং তিনি শতভাগ আন্তরিকতা নিয়ে এ ঐক্যকে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। ইত্তেহাদুল উম্মাহর সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থায়িত্ব লাভ না করলেও তিনি আলেম ও ইসলামপন্থীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার ক্ষেত্রে কখনো কার্পণ্য করেন নি।
মসজিদ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা : আল্লামা সাঈদী পিরোজপুর ও খুলনায় বেশ কয়েকটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ মাদরাসা স্থাপনে আল্লামা সাঈদীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান রয়েছে। ইংল্যাণ্ডের সবচেয়ে বড় মসজিদ ইস্ট লণ্ডন জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠায় মাওলানা সাঈদীর সরাসরি ভূমিকা রয়েছে। তাঁর সরাসরি তত্বধ্বানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে খুলনা দারুল কুরআন সিদ্দিকীয় কামিল মাদরাসা এবং পিরোজপুরের আল্লামা সাঈদী ফাউণ্ডেশন ক্যাম্পাসে তাফহীমুল কুরআন মাদরাসা। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য মাদরাসা, মক্তব প্রতিষ্ঠায় মাওলানা সাঈদী ভূমিকা পালন করেছেন।
সংসদ সদস্য হিসেবে মাওলানা সাঈদী : আল্লামা সাঈদী পর পর দুইবার পিরোজপুর হতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হওয়া সত্বেও তিনি তাদের কাছ থেকে বিপুল ভোট পেতেন। এলাকার হিন্দুরা বলেছে, যে আমরা তার দুই মেয়াদে মায়ের কোলে যেমন নিরাপদ আশ্রয়ে থাকে তেন নিরাপদ ছিলাম। উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বিলি বন্টনে তাঁর দ্বারা একটি টাকাও তসরুফ হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। জাতীয় সংসদে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সব সময় সত্যকে তুলে ধরতেন। মাথা নিচু করে প্রবেশের যে শিরকি নীতি তা তিনি প্রস্তাব এনে পরিবর্তন করিয়েছেন। একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের সরকারের দায়িত্ব কী? এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সামনে রেখে বক্তব্য দিয়েছেন। জাতীয় সংসদের বেশ কয়েকটি অধিবেশনে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন।
লেখক আল্লামা সাঈদী : আল্লামা সাঈদী অনেকগুলো বই লিখেছেন, যে গুলো মানুষকে দীনের সঠিক ও সহীহ বুঝ দিতে প্রেরণার বাতিঘর হিসেবে কাজ করছে। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : তাফসীরে সাঈদী, আখিরাতের জীবনচিত্র, ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা, দেখে এলাম অবিশ^াসীদের করুণ পরিণতি, নন্দিত জাতি নিন্দিত গন্তব্যে, নীল দরিয়ার দেশে, দূর্ণীতিমুক্ত সমাজ গড়ার মূলনীতিসহ মোট ৭৫ টি বই রচনা করেছেন।
তাঁর প্রতি আনীত অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই: আল্লামা সাঈদী কোনো অখ্যাত অপরিচিত ব্যক্তি নন। সত্তরের দশক থেকে তিনি তাফসীর মাহফিলের মাধ্যমে দীনের দাওয়াতী কাজ শুরু করেন। আশির দশকে তাঁর পরিচিতি ও খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এই মানুষটি ১৯৭১ সালে অপরাধ করে এত বছর বীরদর্পে দেশ এবং দেশের বাইরে দাওয়াতে দীনের কাজ করে যাবেন আর কেউ তাঁর অপরাধ সম্পর্কে জানবে না। এটা সম্ভবত পাগলেও বিশ^াস করবে না। আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ আনা হয়েঝে তাকে শুধু মিথ্যাচার বললে কম বলা হয়ে যায়। যিনি এত বিশাল অপরাধ করেছেন আর ধর্মপ্রাণ মানুষেরা পঙ্গপালের মতো তার ওয়াজ শোনার জন্য ছুটে আসবে- এ কথা কল্পনাও করা যায় না। যিনি নিজে অপরাধ করেছেন আর মানুষকে ভালো ভালো কথা বলবেন, এটা একটি অবিশ^াসযোগ্য বিষয়। মূলত আল্লামা সাঈদীর কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য দেশি বিদেশী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে এ সকল বানোয়াট অভিযোগ আনা হয়েছিলো। সম্পূর্ণ অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর যে বিচার হয়েছে তা একটি প্রহসন ব্যতীত কিছুই নয়। দেশ বিদেশের অসংখ্য ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান এ বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে এবং এর মান সম্পর্কে অসংখ্যবার আপত্তি উত্থাপন করেছেন।
তাঁর জন্য মানুষ জীবন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না : সরকার গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল প্রথমে তাঁর বিরুদ্ধে ফাসির রায় ঘোষণা করে। আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে রায়ের প্রেক্ষাপটে সারাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সরকারের ব্যাপক জুলুম নির্যাতন, ধরপাকড় এবং গুলির মূখেও মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। সারা দেশে প্রায় দের শতাধিক মানুষ পুলিশের গুলিতে শাহাদাত বরণ করে। এত জুলুম নির্যাতন এবং ধরপাকড় সত্তে¡ও প্রতিবাদী মানুষ গুলির মূখে দাড়িয়ে যেতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। আল্লামা সাঈদীর প্রতি মানুষের প্রতি এই যে ভালোবাসা এটা ব্যক্তি সাঈদীর জন্য নয়- এটা দীনের দায়ী, কুরআনের পাখি মুফাচ্ছির আল্লামা সাঈদীর প্রতি ভালোবাসা। এতো জীবন আর রক্ত দিয়ে জনতা প্রমাণ করতে চাইছে যে, আল্লামা সাঈদীকে তারা কুরআনের কারণে ভালোবাসে, আল্লাহর জন্য ভালোবাসে। যার কারণে পরবর্তীতে উচ্চ আদালত ফাঁসির রায় পরিবর্তন করে আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করে। এটিও আর একটি প্রহসনই বলা যায়। দণ্ডবিধি অথবা ফৌজাদারী কার্যবিধির কোথাও আমৃত্যু কারাদণ্ড বলতে কিছু নেই। কিন্তু সরকার গঠিত ট্রাইবুনাল এমন একটি শব্দ প্রয়োগ করে তাঁকে মৃত্যুর পর্যন্ত কারাগারে আটক রাখার জন্য এটি করেছে। শেষ পর্যন্ত কারাবন্দীত্বকালে তিনি পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে সঠিক চিকিৎসা পাননি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে বার বার দাবী করা হয়েছে। একই দাবী দেশ বিদেশে অবস্থানরত কোটি কোটি সাঈদী সমর্থকের। সকলে তাঁকে হাসিমূখে হাসপাতালে প্রবেশ করতে দেখেছে। একদিন পরই তিনি এভাবে ইন্তেকাল করলেন, তার চিকিৎসায় কি কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিলো? কেন পরিবারের কোনো সদস্যকে দেখা করতে দেয়া হয়নি? কারাগারে থাকা অবস্থায় তাঁর বুকে কোনো ব্যথা হয়েছিলো কি না ? হার্টের সমস্যা থাকার পরেও কেন তাঁকে পি সি আর করানো হয়নি? এ ধরনের আরো অনেক প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে। জীবন মৃত্যুর মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। মানুষের মৃত্যু যেখানে অবধারিত সেখানেই হবে। প্রশ্ন মৃত্যু নিয়ে নয়। প্রশ্ন হচ্ছে অসুস্থতার পরে কি কি ব্যবস্থা এবং পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিলো? এবং কেন কার্যকর পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়নি। আগামীতে এ প্রশ্নগুলো আরো কঠিনভাবে আসা অস্বাভাবিক নয়।
জানাজা নিয়ে টালবাহানা : আল্লামা সাঈদীর ইন্তেকালের সংবাদ শোনার সাথে সাথে হাজার হাজার লোক হাসপাতালের সামনে ভিড় করতে থাকে। অনেকের মতে এ সংখ্যা সর্বশেষ লাখের ওপর পৌছায়। জনগণ সারারাত হাসপাতালের সামনে থেকে দোয়া দরুদ পাঠ, তাসবীহ পাঠ এভং নারায়ে তাকবীর-আল্লাহু আকবার শ্লোগাণ দিতে থাকে। উপস্থিত জনতাসহ সারাদেশের জনগণের দাবী ছিল- ঢাকায় আল্লামা সাঈদীর জানাজা পড়ার। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করেনি। সারারাত এ নিয়ে প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের সাথে আল্লামা সাঈদীর পুত্র এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ দফায় দফায় আলোচনা করেন। তারা কোনোভাবেই ঢাকায় জানাজা পড়তে দিতে চান নি। জনগণের বার বার দাবীর প্রেক্ষিতে সর্বশেষ প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাত তিনটার সময় বলা হয়, রাতের আধার থাকতেই ঐ সময়ে জানাজা পড়ে লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। উপস্থিত জনতা রাতের আধারে জানাজা পড়তে রাজী হয়নি। তাদের দাবী আমরা দিনের আলোয় আল্লামা সাঈদীর জানাজা পড়তে চাই। শেষ পর্যন্ত সরকারের নির্দেশে প্রশাসনের লোকেরা জোরপূর্বক লাশ নিয়ে পিরোজপুরের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। এ সময় দুঃখ ভাড়াক্রান্ত হৃদয়ে আবেগ উচ্ছল জনতা বাধা দিলে পুলিশ ব্যাপকহারে সাউণ্ড গ্রেণেড, গুলি এবং টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে। যাতে কয়েকশ সাঈদী প্রেমিক জনতা আহত হয়। জনগণের দাবী ছিলো অন্তত সকাল হওয়ার পর একটি জানাজা পড়ার ব্যবস্থা করা হোক, কিন্তু তারা কোনোক্রমেই তা করতে দিতে রাজী হয়নি। সর্বশেষ বলা হয়েছিলো যে, ১৬ আগস্ট গায়েবানা জানাজা পড়া হবে, সেখানেও পুলিশ বলেছে কোনোভাবেই জানাজা নামাজের অনুমতি দেয়া হবে না। পুলিশের এই বক্তব্য কোনোভাবেই আইন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং সাংবাবিধানিক অধিকারের সাথে যায় না। কারো জানাজা নামায পড়ার জন্য পুলিশের অনুমতি দিতে হবে, মানুষ এই প্রথম শুনলো। পিরোজপুরে জানাজা নামায আদায়ে তড়িঘড়ি করার জন্য পুলিশ বার বার চাঁপ দিতে থাকে। যার কারণে প্রথম জানাজায় আল্লামা সাঈদীর বড় ছেলে শামীম সাঈদী অংশ্রহণ করতে পারেন নি। একইভাবে পিরোজপুরের আশে পাশের জেলা থেকে যে সকল মুসুল্লী গিয়েছেন তাদের অনেকেই প্রথম ও দ্বিতীয় জানাজায় শরীক হতে পারেন নি। এমনকি সারা দেশে যে অসংখ্য জানাজা হয়েছে বেশ কয়েক যায়গায় গায়েবানা জানাজা আদায়ে বাধা দিয়েছে, হামলা করেছে। চট্টগ্রাম জানাজা শুরুর আগেই পুলিশ মুসুল্লীদের ওপর ব্যাপক লাঠিচার্জ, টিয়োরসেল ও ও গুলি করে অসংখ্য মুসুল্লীকে আহত করে এবং গ্রেফতার করে। কক্সবাজারে পুলিশের সামনে সরকার দলীয় ক্যাডার বাহিনীর লোকেরা হেলমেট পড়ে জানাজা নামাযে আগত মুসুল্লীদের ওপর গুলি করেছে, এতে একজন মুসুল্লী মারা গিয়েছেন।
পিরোজপুরে অসংখ্য জানাজা : পিরোজপুরে শহরে সারাদিনই লোক গমন করতে থাকে এবং সেখানকার জনগণের বরাতে জাতীয় দৈনিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানতে পারা যায় যে, সারাদিনই আল্লামা সাঈদী ফা্নউণ্ডেশন মাঠে জানাজা নামাজ আদায় হয়েছে। পিরোজপুর শহরে প্রবেশে বাধা দেয়া, পুলিশী হয়রাণি, আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের হামলা হুমকি ধমকির কারণে অসংখ্য মানুষ যথাসময়ে পিরোজপুর শহরে প্রবেশ করতে পারেন নি। যার কারণে সেদিন গভীর রাত পর্যন্ত একের পর এক জানাজা চলমান ছিলো। ঐ দিন সারা রাত জনগণ স্রোতের মতো গিয়েছে এবং কবর জিয়ারত করেছে। বিভিন্ন সূত্রের বরাতে শোনা গেছে কবর জিয়ারতেও নাকি বার বার বাধা প্রদান করা হয়েছে।
সারা দেশে অসংখ্য গায়েবানা জানাজা : সারাদেশের মানুষ আশায় ছিলো যে, ঢাকায় একটি জানাজা হবে এবং তারা সেখানে যোগদান করবে। কিন্তু সরকার অজানা আতঙ্ক ও ভয় থেকে ঢাকায় জানাজা নামায আদায় করতে দেয়নি। তারা ভেবেছে আল্লামা সাঈদীর যে আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা, এই জনতা যদি ঢাকায় আসে হয়তো তারা সরকার বিরোধী কোনো আন্দোলন করবে। অথচ সাধারন জনগণের শুধু একটি দাবী ছিলো, যে তারা একটি জানাজা আদায় করতে চায়। এর সাথে কোনো প্রকার রাজনৈতিক আন্দোলনের ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। কিন্তু সেই সূযোগটুকু না দেয়ার কারণে সারা দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যন্ত অসংখ্য গায়েবানা জানাজা নামায আদায় হয়েছে। জেলা শহরের জানাজাগুলোতে লক্ষাধিক লোক হয়েছে। বগুড়ার প্রতিটি ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ডে গায়েবানা জানাজা হয়েছে, সেখানকার লোকেরা জানিয়েছেন যে, বগুড়ায় দেড় শাতধিক স্থানে জানাজা নামাজ আদায় হয়েছে।
ঢাকার জানাজা হতে পারতো বিশ্ব ইতিহাসে একটি অনন্য নজির : আল্লামা সাঈদীর প্রতি বাংলাদেশ ও বিশ্ব ইতিহাসের মানুষের যে কি পরিমাণ ভালোবাসা তা মূলত শুধুমাত্র লেখার হরফে কিংবা একটি জানাজার উপস্থিতি দিয়ে বিবেচনা করা যাবে না। সরকার বাধা না দিয়ে মানুষের আবেগ ও অনুভুতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঢাকায় জানাজা নামায আদায় করতে দিলে এটা হতে পারতো বিশ্ব ইতিহাসের অনন্য নজির। মানুষের চিন্তা, ভাবনা এবং কল্পনার চেয়ে কয়েকগুণ মানুষ এ জানাজায় শরীক হতো।
পৃথিবীর দেশে দেশে অসংখ্য জানাজা : আল্লামা সাঈদীর ওয়াজের বাণী পৌছেনি পৃথিবীতে এমন দেশের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ইউ এস এ, ইউ কে, আয়ারল্যাণ্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, তুরস্ক, সৌদী আরবের দুই পবিত্র শহর মক্কা ও মদীনা, বাইরাইন, কাতার, কুয়েত, ওমানসহ পৃথিবীর প্রায় দেড় শতাধিক দেশে আল্লামা সাঈদীর জন্য গায়েবানা জানাজা ও দোয়ার মাহফিল হয়েছে।
সকল মহলের পক্ষ হতে শোকবাণী : আল্লামা সাঈদীর ইন্তেকালে শোকবাণী দিয়েছেন দেশ ও বিদেশের বড় বড় ইসলামী স্কলার, ইসলামী ব্যক্তিত্ব, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলসমূহ। দেশের যারা শোকবাণী প্রদান করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বি এন পির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, হেফাজতে ইসলমের আমীর আল্লামা বাবুনগরী ও মহাসচিব শায়েখ সাজিদুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতী সৈয়দ রেজাউল করীম, খেলাফত মজলিশের ভারপ্রাপ্ত আমীর আবদুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব আহমদ আবদুল কাদের, মাওলানা মাহফজুল হক, দারুল মাআরিফ চট্টগ্রামের মুহতামিম আল্লামা সুলতান যওক নদভী, ড. এনায়েত উল্লাহ আব্বাসী, আল্লামা আতাউল্লাহ হাফেজ্জী, মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, মাওলানা সালমান নদভী, মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ, শায়খ আহমদুল্লাহ, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, মিজানুর রহমান আজহারী, আলী হাসান উসামাসহ অসংখ্য বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ। দেশের বাইরে থেকে যারা শোকবাণী দিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন : পবিত্র মসজিদ কাবার ইমাম আবদুর রহমান আস সুদাইসী, মিশরের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ প্রফেসর ওয়াসফি আশুর, আমেরিকার প্রখ্যাত দায়ী মুহাম্মদ সালাহ, পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর সিনেটর সিরাজুল ইসলাম, বিশ্ববিখ্যাত ইসলামিক স্কলার ড. জাকির নায়েক, মিশরের মজলুম সংগঠন ইখওয়ানুল মুসলিমিন, গ্লোবাল ইসলামিক স্কলারসহ অসংখ্য ব্যক্তি ও সংস্থা।
মিডিয়াগুলো হীনমন্যতার পরিচয় দিয়েছে : দেশের মূল ধারার বেশ কয়েকটি মিডিয়াই আল্লামা সাঈদীর ইন্তেকালের সংবাদ প্রকাশ করেছে। আল্লামা সাঈদীর ইন্তেকালের সংবাদ পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে এমন দু একটি পত্রিকা এবং টেলিভিশনও জনগণের নজর এড়ায়নি। তারা আল্লামা সাঈদীর ইন্তেকালের সংবাদ প্রকাশ না করে আল্লামা সাঈদীর কোনো ক্ষতি করতে পারেনি বরং নিজেরাই জনগণের কাছে হীনমন্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একইভাবে আল্লামা সাঈদীর জানাজায় লাখ লাখ জনতার উপস্থিতি, সারাদেশে গায়েবানা জানাজাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের শোকবাণী প্রদানের খবরটি প্রকাশ করলে এ সকল মিডিয়া বরং একটি ভালো সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করার কৃতিত্ব অর্জন করতে পারতো। এটা না করে তারা যে মনের সংকীর্ণতার পরিচয় দিয়েছে এতে তারাই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। সোস্যাল মিডিয়ার যুগে মানুষ মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার চেয়ে এখন এর মাধ্যমে অতি দ্রতি সংবাদ পেয়ে থাকে। যারা আল্লামা সাঈদীর সংবাদ প্রকাশে হৃদয়ের প্রশস্ততার পরিচয় দিতে পারেনি কিংবা যারা নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করেছে, তারা বরং বিপুল ও বিশাল জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। কারণ আল্লামা সাঈদী কোনো দল বা গোষ্ঠীল সম্পদ নয়, তিনি গোটা মুসলিম উম্মাহর সম্পদ। আল্লামা সাঈদীর ইন্তেকালে শোকাহত কোটি কোটি মানুষ। শোকের সাথে ভালোবাসা জড়িত। মানুষের এ ভালোবাসা ছড়িয়ে যাবে যুগ ও কালের গণ্ডি পেড়িয়ে অনাদিকাল পর্যন্ত।
আল্লামা সাঈদী বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল : পৃথিবীর অগণন মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত আল্লামা সাঈদী। দল, মত, মতাদর্শ আর মানচিত্রের সীমানা পেড়িয়ে তিনি বিশ্বাসী মানুষের হৃদয়ে স্বমহিমায় উজ্জল। তার হাতে ছিলো হেরার রাজতোরণ থেকে আসা মানব মুক্তির মহা সনদ আল কুরআন। এ কুরআনকে তিনি হৃদয়ে ধারণ করেছেন। নিজেকে একাকার করে দিয়েছেন কুরআনের মানচিত্রের সাথে। ধ্যান-জ্ঞান আর চিন্তায় এ মহাগ্রন্থের আলোক উদ্ভাসিত আহ্বান তার গোটা জীবন জুড়ে। আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাগরকে ঘিরে পৃথিবীর যত জনপদ, সেখানেই তিনি গিয়েছেন কুরআনের আহ্বান নিয়ে। কুলআনের সুললিত তেলাওয়াত হৃদয়কাড়া আহ্বান কোটি হৃদয়ে আশার আলো জালিয়েছে। আশার ফাগুনে নতুন ফুলগুলো মহীরুহ হয়ে দিক দিগন্তে ছড়িয়ে গেছে। তিনি আছেন কোটি মানুষের হৃদয়ের মনিকোঠায়, আছেন এ দেশের সবুজ ঘাসের ডগায়, পত্র পল্লবে। ব্যক্তি সাঈদীর মৃত্যু হলেও তিনি যে আদর্শকে লালন করেছেন, আল কুরআনের যে আহ্বান ছড়িয়ে দিয়েছেন, তাওহীদের যে বিজয় নিশান উড়িয়েছেন তা মানুষকে যুগ থেকে যুগান্তেরে আলোকের পথে ডাকতে থাকবে। তার ত্যাগ আর কুরবানীর ওপর নতুন যে ঘাস উঠবে। সে ঘাসের প্রতিটি বিন্দুতে আরো শত শত আল্লামা সাঈদীর উত্থান হবে ইনশাআল্লাহ।

(মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান)

পঠিত : ৪৯৯ বার

মন্তব্য: ০