Alapon

শাপলার কালো রাত : স্বাধীনতা বিধ্বংসের এক অশনি সংকেত

হাতের আঙুলের কর গুনে দেখলাম এগারো বছর হয়ে গেছে। তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। বাজারের মাদ্রাসায় আবাসিকে থাকতাম। সারাদিন খুব উত্তেজনার মধ্যে গেলো সবার। শিক্ষক, ছাত্র সবাই গভীর উদ্বিগ্ন। কি হচ্ছে ঢাকায়! মফস্বলে থেকে ত এতো কিছু বোঝা যায়না। টিভি দেখার সুযোগ নাই। মাদ্রাসার বড় হুজুর যোহরের পরে ছাত্রদের নিয়ে মুনাজাতে বসেছিল মতিঝিলের নিরীহ মুসুল্লিদের জন্য দোয়া কামনায়। এক শিক্ষক কিভাবে যেন খবর মেনেজ করতেছে ঠিক মনে নাই। তবে কিছু কিছু আপডেট ওনার মাধ্যমে সবাই পাচ্ছে।
বলছিলাম দুহাজার তেরো সালের পাঁচ মে'র কথা। শাহবাগে কথিত গনজাগরণের নামে আল্লাহ ও রাসূলের অবমাননাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি, নাস্তিক -মুরতাদদের আস্ফালন বন্ধ, শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কার, সংবিধান সংশোধন, স্বাধীন সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রামে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণসহ মোট ১৩ দফা দাবি নিয়ে তৎকালীন আমীরে হেফাজত আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহঃ এর ডাকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ব্যানারে ঐতিহাসিক শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশে আগত মুসুল্লিদের কথা। যারা জীবনে কখনো নিজেদের উপজেলা শহরের বাইরে সম্ভবত যায়নি তারাও এসেছে ঈমানী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে খোদ রাজধানীতে। তাদের মধ্যে আছে অসংখ্য ইয়াতিম, হতদরিদ্র, খেটে খাওয়া মানুষ। যারা নিছক তাওহীদবাদী। দুনিয়াবী স্বার্থ নেই এদের মনে।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে শাপলা চত্বর, আরামবাগ, নাইটিঙ্গেল,বিজয় নগর,পল্টন মোড়,গুলিস্তান জিপিও,বায়তুল মোকাররম মসজিদ, কাকরাইল সহ আশপাশের এলাকাগুলো জনসমুদ্রে রুপান্তর হয়। চট্টগ্রাম থেকে হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ইতোমধ্যে মঞ্চে চলে এসেছেন। ঢাকায় অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দিচ্ছেন। সারাদেশে তাওহীদি জনতার মনে একটা আশা সঞ্চার হয়েছিল না জানি আজকে দেশের ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। এদিকে সরকারি মহল থেকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান রাখা আছে। হেফাজতের এই কর্মসূচিতে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে দেশের আপামর তাওহীদি জনতা সাড়া দিয়েছে। কি জামায়াত! কি খেলাফত! সবাই ইসলাম এবং দেশের স্বার্থে রাজপথে নেমে এসেছিল।
আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে মুখরিত ঢাকার রাজপথ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা এলো। সরকারের তরফ থেকে বারবার সতর্ক করে সরিয়ে যেতে বলা হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মুসুল্লিসহ ওলামায়ে কেরাম অনড়। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা শাপলা চত্বর ছাড়বে না। সন্ধ্যার দিকে মঞ্চ থেকে ঘোষণা এলো প্রয়োজনে রক্তের বন্যা বয়ে দিবে, তবুও তারা অটল থাকবে। তাওহীদি জনতার এই মহাসমাবেশের খবর তৎকালীন মিডিয়া গুলো ভালোভাবে প্রচার করছে না,দু'একটি ছাড়া। দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি সরাসরি সম্প্রচার করছে মহাসমাবেশের। যার দরুন ভয়াবহ খেসারত দিতে হলো এই জনপ্রিয় দুই টেলিভিশন চ্যানেলকে। সাময়িক সম্প্রচার বন্ধের নামে ঐদিন রাতেও অলিখিতভাবে বন্ধ করে দেওয়া হলো চ্যানেল দুটি। বেকার হয়ে গেলো হাজারো সাংবাদিক, কর্মজীবী মানুষ। জাতীয় দৈনিক আমার দেশ পজিটিভ নিউজ করছিলো মহাসম্মেলন ঘিরে। কিন্তু কয়েকটি মেইনস্ট্রিম মিডিয়া একেবারে নিজেদের সাংবাদিকতার নীতিকে উলঙ্গ করে যেভাবেই পারছে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এই জমায়েতকে জঙ্গিবাদের উত্থান বলে প্রচার করছে।
রাতে শাপলার আশপাশে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো।
গভীর রাতে মহান মনিবের দরবারে নিরস্ত্র মুসলমানরা যখন তাহাজ্জুদের জায়নামাজ বিছিয়ে ফরিয়াদ করতেছে, কেউবা আরামে ঘুমাচ্ছে এমন সময় নারকীয় তাণ্ডব শুরু হয়। গরমপানির কামান,টিয়ারগ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, অবিরত ব্রাশফায়ারে শাপলা চত্বর খালি হয়ে যায়। নিস্তব্ধ হয়ে যায় ঢাকার ব্যস্ততম রাজপথ।আসলেই রক্তের বন্যা বয়ে যায়। ইতোমধ্যে হেফাজতের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সূর্য ওঠার সাথে সাথে পরিষ্কার হয় ঢাকার রাজপথ। গনগ্রেফতার শুরু হয়।
ঠিক কিরকম লোক জমায়েত হয়েছে তার সঠিক হিসাব ছিল না আয়োজকদের হাতে। এমনকি আজ পর্যন্ত কতজন মানুষ শাহাদাতের পেয়ালা পান করছে তারও হিসাব নিকাশ হয়নি সুষ্ঠভাবে।তবুও কিছু জরিপ প্রকাশ হয়েছে
। ২০১৩ সালের ৫ মে গভীর রাতে পুলিশের গুলিতে নিহতের সংখ্যা: মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এর তথ্যমতে: ৬১ জন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ'র তথ্যমতে: ৫০ জন, সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়: ১১ জন। শাপলার ঘটনার পরে আল্লামা শফী বলেছিল ৫মে গনহত্যা চালানো হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে হেফাজতের এই মহাসমাবেশ নিয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন,
সেদিন কোন গোলাগুলি হয়নি এবং কেউ মারাও যায়নি। সবাই গায়ে রঙ মেখে শুয়েছিল।
এরপরেও হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমীরের উপস্থিতিতে রাজধানীতে প্রধানমন্ত্রীকে শোকরানা মাহফিলে এনে সংবর্ধিত করা হয়। তাইতো মনে হয়, কবি মুহিব খান লিখেছেন:❝বেফাকে নেফাক- হেফাজতে নাজাসাত।❞
এখনো ইসলাম এবং দেশের স্বাধীনতা বিদ্বেষীদের ক্রমাগত স্রোত বেড়ে চলছে। আলেম উলামারা অনেকে আপোষহীন চেতনা হারিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল নিয়ে মত্ত। দলমত নির্বিশেষে এক কাতারে শামিল হওয়ার কোন ইঙ্গিত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন কিসিমের জিনিস আমদানি করে শিক্ষার্থীদের ধর্মবিমুখ করার পাশাপাশি ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মানবিক মানুষ তৈরি হচ্ছে না। নৈতিকতাহীন অসভ্য সমাজ প্রতিষ্ঠার মিশন বিনা আওয়াজে এগিয়ে চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভয়ংকর থাবা ধেয়ে আসছে। দেশের পরিবেশ ইসলাম ধর্মের মানুষদের জন্য সংকুচিত হয়ে আসছে। সত্যিই বাংলার ভাগ্যকাশে আমাবস্যার রাত চলে আসবে। যার সুবহে সাদিক দেখা মুশকিল। আরও অনেক বছর পূর্বে শহিদ আল্লামা দেলোয়ার সাঈদী রহঃ জোরালো আওয়াজ তুলেছিলেন। তখনো আমরা বুঝিনি। নয় সালে পিলখানা ট্র্যাজেডি হলো। দিনদুপুরে মেরে ফেলা হলো চৌকস সেনাকর্মকর্তাদের। সীমান্ত নিরাপত্তাকে ভোঁতা করে দিলো তখন। নয় থেকে তেরো। চারবছরের পালাবদলে আবারও গনহত্যা হলো। তেরো থেকে চব্বিশ। এগারো বছরে স্বাধীন মানচিত্রকে হত্যার দিকে ধাবিত করছে। আমরা কবে টের পাবে? ঘুম পাড়ানী মাসিপিসির গান শুনে তারুণ্যের শক্তি স্তিমিত হয়ে আসছে। জাগতে হবে তারুণ্যকে। শাপলার কালো রাতের শহীদরা জান্নাতের সবুুজ পাখি হয়ে উঠুক। তারা সর্বোচ্চ পুরষ্কারের অধিকারী হোক।
দেশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে আবারো আলেম উলামাদের ভূমিকা রাখতে হবে। জেগে উঠুক শাপলা। নেফাকী দূর হোক। আমাদের সবুজ শ্যামল বাংলাদেশের আপামর জনতা নিজেদের স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ উপভোগ করুক। আল্লাহ আমাদের সাহায্যকারী হোক।

পঠিত : ১৬৯ বার

মন্তব্য: ০