Alapon

রাস্তায় তাদের দালানকোঠা! 



ব্যস্ততম মহাসড়ক। চলছে দামী গাড়ি,বা সাথে মোটরসাইকেল।আবার বেশ দাপটের সাথে রাস্তায় রাজত্ব করছে লোকাল বাস গুলো। গাড়ির হর্ণে যাত্রীরা অস্বস্তিতে আছে অনেকটা। একজন বলেই উঠলো,মামা আর হর্ণ দিয়েন না,কান ফেটে যাচ্ছে।কে শোনে কার কথা!  সবার যে তাড়া। 

এতো শব্দের মধ্যেও ডিভাইডারে চটের বস্তার উপর আরামে ঘুমাচ্ছে মনু মিয়া। মনু মিয়ার বাড়ি ঘর নেই। রাস্তায় তার ঘর। বয়স পনেরো ষোলো হবে আনুমানিক। চুল গুলো কোঁকড়ানো। মনু মিয়া জানেনা তার ঠিকানা কোথায়? ছোট বেলা থেকে শুনে আসছে বাবা-মা মারা গেছে সড়ক দুর্ঘটনায়। পড়াশোনা করার ইচ্ছে জাগে মাঝেমাঝে। কিন্তু সেটা স্বপ্ন পর্যন্ত থেকে যায়। বাস্তব হওয়ার কোন লক্ষন নেই। মনু মিয়ার বন্ধু শাকিল, পিন্টু, আরিফ।বোতল কুড়াতে গিয়ে এদের সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠে মনু মিয়ার।  এরাও রাস্তায় শুয়ে পড়ে অনেক সময়। এদের ভাগ্য অবশ্য ভালো। বাবা-মা আছে। বোতল কুড়িয়ে সংসারে কিছু খরচপাতি দেয়। বাকি গুলো দিয়ে নিজে চলে। আর মনু মিয়া সব টাকা নিজে রেখে দেয়। দৈনন্দিন খরচপাতি শেষ করার পরে কিছু টাকা জমিয়ে রাখে। সপ্তাহে ভালোমন্দ খাওয়ার জন্য। কিন্তু তা হয়ে ওঠে না। ঘুমোতে গেলে কেউ একজন তার টাকা চুরি করে ফেলে। এনিয়ে তার দুঃখের শেষ নাই। অনেক সময় হাত তুলে আল্লাহর দরবারে দোয়া করে, আয় আল্লাহ, যে আমার টাকা নিচে তারে তুমি দেইখা লইয়ো। 

একদিন খুব আয়েশি ভঙ্গিতে ঘুমাচ্ছে মনু মিয়া। এ দৃশ্য চোখে পড়ে হাফিজ সাহেবের। হাফিজ সাহেব একটা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের এমডি। দুই ছেলে। একজন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ও লেভেলে পড়ে। আরেকজন ক্লাস সেভেনে। বেতন লাখের কাছাকাছি। কোম্পানি থেকে প্রাইভেট কার দেওয়া। অফিসে যাতায়াত সে গাড়ি দিয়েই। হাফিজ সাহেবের রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়না। ঘুমের ঔষধ খেতে হয়। নানামুখী চিন্তায় তার মাথা কিলবিল করে। মনু মিয়ার ঘুম দেখে হাফিজ সাহেব কিঞ্চিৎ অভিভূত হয়ে গেলো। তার মনে প্রশ্ন জাগে আমি এতো আয়োজন করেও শান্তিমতো ঘুমাতে পারিনা। অথচ এতো আওয়াজের মধ্যে পোলাডা কিভাবে ঘুমাচ্ছে। ড্রাইভার সুজনকে একথা জিজ্ঞেস করলো। সুজনের জবাব, স্যার তাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। রাস্তায় তাদের দালানকোঠা। 

অফিসে যাওয়ার পরে হাতে কিছু কাজ ছিল। এগুলো শেষ করে পত্রিকা নিয়ে বসলো হাফিজ সাহেব। একটা প্রতিবেদনে চোখ আটকে গেলো তার।  পত্রিকার প্রথম পাতায় লাল কালিতে একপাশে লেখা ❝দেশে ৩৪ লাখ শিশু রাস্তায় বসবাস করে : গবেষণা ❞। 

গবেষণায় বলা হয়েছে বাংলাদেশে রাস্তায় বসবাসকারী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩.৪ মিলিয়ন। তারা দারিদ্র্য, অপুষ্টি, রোগ, নিরক্ষরতা ও সহিংসতাসহ নানা বঞ্চনার শিকার। তাদের শোচনীয় এই পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে ‘বাংলাদেশে রাস্তার পরিস্থিতিতে শিশুরা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। 

উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, দেশের মোট পথশিশুদের মধ্যে  ৩৬% ঢাকায় বসবাস করে। 

পত্রিকার পাতায় বিভিন্ন সময় পথশিশুদের নিয়ে সুন্দর প্রতিবেদন ছাপা হয়। তাদের অধিকার নিয়ে অনেকের বক্তব্য থাকে সেসব প্রতিবেদনে। দেখা যায় বিভিন্ন সংস্থা পথশিশুদের নিয়ে দারুণ আয়োজন হাতে নেয়। দিবস ভিত্তিক খাবার বিতরণ, ঈদের পোষাক বিতরণ, স্বাক্ষরতা দিবসে বর্ণমালার বই বিতরণ ইত্যাদি। 

অনেক ঝুঁকির মধ্যে আছে রাস্তায় বসবাসকারী মনু মিয়ার মতো শিশুরা। তাদের দিয়ে একটি চক্র ঘৃণ্য অপরাধ করে থাকে।রাস্তায় জ্যামের মধ্যে আটকে থাকা বাসের যাত্রীদের মোবাইল চুরি অন্যতম। এসব শিশুরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাদকের সাথে পরিচয় ঘটে। ড্যান্ডি খায়।  ক্ষুধার তাড়নায় তারা এসব করতে বাধ্য হয়। মানুষের নিকট টাকা খোঁজে। না পেলে পা জড়িয়ে ধরে। 

দেশে মনু মিয়াদের নিয়ে ভাববার সময় নেই হর্তাকর্তাদের। অথবা তাদের নিয়ে চিন্তা করে সমাধানের পথ খুঁজে পাচ্ছে না। জাতিসংঘ ঘোষিত মৌলিক অধিকার গুলো থেকে বঞ্চিত এসব শিশু। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এরা ভয়ংকর রকমের অপরাধী হয়ে ওঠতে পারে। সমাজের প্রতি এদের কোন দরদ থাকবেনা স্বাভাবিক। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। নানা নিগ্রহের শিকার হয়েও রাস্তায় তাদের আপনজন। দিনশেষে ফ্লাইওভারের নিচে, ওভারব্রিজের উপরে, রেলওয়ে স্টেশন, ডিভাইডার তাদের নিকট শান্তির জায়গা।

পঠিত : ৪৯ বার

মন্তব্য: ০