Alapon

যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় : কারণ ও প্রতিকার



আইয়ামে জাহেলিয়াত তথা অন্ধকার যুগের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। এহেন কোনো খারাপ কাজ ছিল না, যা সেই যুগের মানুষ করতো না । নৈতিকতার লেশমাত্রও ছিল না তাদের মাঝে । ধর্মচর্চা আবদ্ধ ছিল মূর্তিপূজার ভিতর। নানা কুসংস্কারে জর্জরিত ছিল সমাজব্যবস্থা। হত্যা, লুণ্ঠন, রাহাজানি, যিনা-ব্যভিচার, মদপান, কন্যাশিশু হত্যা ইত্যাদি ছিল সেই যুগের মানুষদের নিত্যাকার অভ্যাস। আজকের দিনেও সমাজের চিত্রটা তার খুব ব্যতিক্রম নয়। শুধু পাল্টেছে অপরাধের ধরন ও উপকরণ।

নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষাব্যবস্থা আর অসৎ নেতৃত্ব আগুনে ঘি ঢালার কাজ করছে সমাজটাকে নষ্ট করতে। সাম্রাজ্যবাদীরা রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি সকল দিক থেকে গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ করতে একের একের পর এক দাবার গুটি চেলে যাচ্ছে, আর উদাসীন মুসলমানরা সেই ফাঁদে বারবার পতিত হচ্ছে অনায়াসে। পশ্চিমা সভ্যতা নামক অসভ্যতাকে অবলীলায় গ্রহণ করে নিচ্ছে যুবসমাজ। এদের মধ্যে কাজ করছে না ঈমানী চেতনা, উম্মাহর কল্যাণচিন্তা এমনকি নিজের পরকালীন মুক্তির ব্যাপারেও তারা চরমভাবে উদাসীন । তরুণ-যুবকেরা আজ জাহেলিয়াতের করাল গ্রাসে আচ্ছন্ন হয়ে হন্যে হয়ে ছুটে যাচ্ছে জাহান্নামের দিকে। কেন তাদের এই অধঃপতন ? কিসের অন্ধকারে হাতরে মরছে তারা ? আর কিসে রয়েছে এ থেকে মুক্তি ? চলুন খুঁজে বের করার চেষ্টা করি।

অবক্ষয়ের কারণ:
১. পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুপস্থিতিঃ
পরিবার হচ্ছে সমাজের ক্ষুদ্রতম একক। নৈতিক শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এটি। আর তাই নৈতিক অবক্ষয়ের সবচেয়ে বড় যে কারণ, সেটি হচ্ছে পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুপস্থিতি। অধিকাংশ পরিবার‌ই দ্বীনি শিক্ষা ও বিধান সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। দ্বীন শিক্ষার গুরুত্ব, নৈতিকতা ও মানবতাবোধের চর্চা পরিবার থেকেই শুরু হ‌‌ওয়া উচিত। কিন্তু দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতার দরুণ নৈতিক শিক্ষা দিতে পরিবারগুলো বরাবরের মতোই ব্যর্থ হচ্ছে। চরিত্র ধ্বংসের যে উপাদানের সাথে ছেলে-মেয়েরা সবার আগে পরিচিত হয়, তা শুরু হয় পরিবার থেকেই। টেলিভিশন, মোবাইল, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সহশিক্ষা প্রভৃতির মাধ্যমে শুরু থেকেই একটা ভুল মেসেজ নিয়ে বেড়ে উঠছে আমাদের সন্তানরা। নৈতিক শিক্ষা না থাকায় তাদের ভাষা, আচরণ, আদব-কায়দা সঠিকভাবে গড়ে উঠছে না। পর্দার বিধান পালন, মৌলিক ইবাদতের প্রতি আগ্রহ, ইসলামী সংস্কৃতি লালন ও অপসংস্কৃতির চর্চা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা তারা একেবারেই পাচ্ছে না পরিবার থেকে। ফলশ্রুতিতে একটা ভুল কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে বাল্য ও তরুণকাল শুরু করছে তারা। এর চূড়ান্ত ফলাফল হচ্ছে বর্তমান যুবসমাজের এই চরম নৈতিক অবক্ষয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এভাবে। একটি চারাগাছের মতো সন্তানদেরকে সঠিক শিক্ষা ও কাঠামোতে গড়ে তোলার বিপরীতে একটি সুস্থ সমাজের আগাছারূপেই গড়ে তোলা হচ্ছে নতুন প্রজন্মকে। সন্তানের উপর পরিবারের প্রভাব সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন- “প্রত্যেক নবজাতক ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার মাতাপিতা তাকে ইয়াহুদী বা নাসারা অথবা অগ্নি উপাসক করে। ” (সহিহ বুখারিঃ ১৩৮৫)

২. সহশিক্ষাঃ
যুবসমাজের চরিত্র ধ্বংসের নীরব ঘাতক হচ্ছে সহশিক্ষা। নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ এটি। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সহশিক্ষার প্রভাবে নৈতিক অবক্ষয়ের চরম সীমায় পৌঁছে গেছে যুবসমাজ। বোধ-বুদ্ধি হ‌ওয়ার সূচনালগ্ন থেকে ছেলে-মেয়েদের পারষ্পরিক অবাধ মেলামেশা, অবৈধ প্রেম, যিনা, ধর্ষণ ও ইভটিজিংয়ের অবারিত দুয়ার খুলে দিয়েছে এই সহশিক্ষা, যার প্রভাব শুধু যুব অঙ্গনেই নয়, পুরো সমাজেই পড়েছে । এর চরম পরিণতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে স্বয়ং রাষ্ট্রযন্ত্র। আর এমনটা হ‌ওয়াও খুব‌ই স্বাভাবিক ব্যাপার। আল্লাহর নীতির বাইরে গিয়ে অনৈতিকতার অবাধ সুযোগ তৈরি করে, বিচারব্যবস্থায় আল্লাহর নীতিকে উপেক্ষা করে মানুষের তৈরি আইনকে প্রাধান্য দিয়ে যে শান্তির প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তা কখন‌ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

৩. নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষাব্যবস্থাঃ
নৈতিক অবক্ষয়ের আরেকটি প্রধান কারণ নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষাব্যবস্থা। নামেমাত্র নৈতিকতার নির্যাস দিয়ে প্রণয়ন করা শিকাব্যবস্থা সনদধারী শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছে বটে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে বরাবরের মতোই ব্যর্থ হচ্ছে। ধর্মীয় শিক্ষাকে ক্রমান্বয়ে উপেক্ষা করে চলছে রাষ্ট্রযন্ত্র। সিলেবাস কমানোর নামে ধর্ম বিষয়কে পরীক্ষার বাইরে রাখা হয়েছে। নৈতিকতার প্রকৃত শিক্ষা সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় নেই বললেই চলে। আর যা-ওবা শেখানো হচ্ছে, তাও দায়সারা। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার বড় অংশটাই এখন অফিসিয়াল হয়ে গেছে, দ্বীনের বুনিয়াদি শিক্ষা এখান থেকে শেখানো হচ্ছে না। বস্তুবাদী চিন্তাভাবনা নিয়েই অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে । আর শিক্ষকরাও মনে করেন, তারা চাকরি করেন, শিক্ষকতা নয়। উম্মাহর জন্য যেন তাঁদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি বীতশ্রদ্ধ মনোভাব বরাবরের মতোই প্রকাশ পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। খোদ কোনো কোনো সংসদ সদস্য সংসদে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় শিক্ষার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। নৈতিকতা ধ্বংসের যাবতীয় ব্যবস্থাই তারা করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি নতুন কারিকুলামে নাস্তিক্যবাদ, বিকৃত ট্রান্সজেন্ডার মতমাদ, ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা, যৌনশিক্ষা ইত্যাদি বিষয় যুক্ত করে যুবসমাজকে ধ্বংসের চূড়ান্ত আঘাত হানা হয়েছে।

৪. সাংস্কৃতিক আগ্রাসন
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের মতোই বরং তার চাইতেও বেশি মারাত্মক ষড়যন্ত্রের নাম সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। সংস্কৃতি মানুষের জীবনযাত্রা বা লাইফস্টাইলকে নিয়ন্ত্রণ করে। তথাকথিক পশ্চিমা সংস্কৃতি যুবসমাজের চরিত্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এনে দাড় করিয়েছে। পশ্চিমা সভ্যতা এমনভাবে আমাদের আষ্টেপৃষ্টে আছে যে, তাদের চিন্তার বাইরে আমরা কোনো কিছু চিন্তা করতে পারছি না। মাওলানা মওদূদীর ভাষায় বললে, “দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমানে কোনো মুসলিম জনপদই সত্যিকারভাবে রাজনৈতিক ও মানসিক দিক দিয়ে পুরোপুরি স্বাধীন নয়। কোথাও তারা রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ভোগ করলেও নৈতিক্ক ও মানসিক গোলামি থেকে আদৌ মুক্ত নয়। তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত, হাট-বাজার, সভা-সমিতি, ঘরবাড়ি, এমনকি তাদের আপন দেহ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিচ্ছে, পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতি, চিন্তাধারা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান তাদের উপর পুরোমাত্রায় কর্তৃত্বশীল। তারা পাশ্চাত্যের মগজ দিয়ে চিন্তা করে, পাশ্চাত্যের চোখ দিয়ে দেখে, পাশ্চাত্যের নির্দেশিত পথ অনুসরণ করে চলে। তারা উপলব্ধি করুক আর নাই করুক, তাদের মগজের উপর এই ধারণাই চেপে রয়েছে যে, পাশ্চাত্য যাকে সত্য মনে করে, তাই সত্য, আর সে যাকে মিথ্যা ঘোষণা করেছে, তা-ই মিথ্যা। তাদের মতে সত্যতা, যথার্থতা, সভ্যতা, নৈতিকতা, ভদ্রতা, শালীনতা ইত্যাদি ব্যাপারে পাশ্চাত্যের নির্ধারিত মানদন্ড হচ্ছে একমাত্র নির্ভুল মানদন্ড। এমনকি নিজেদের দ্বীন ও ঈমান, চিন্তাধারা ও ধ্যান-ধারণা, সভ্যতা ও শালীনতা, চরিত্র ও রীতিনীতি সবকিছুই তারা ঐ মানদন্ডে যাচাই করে। ” (ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ; পৃষ্ঠা- ৮)
পাশ্চাত্যের রক মিউজিক, কম্পিউটার গেমস, ব্যান্ড মিউজিক ইত্যাদির মাধ্যমে সাংস্কৃতিকভাবে এক চরম অধঃপতনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে যুবসমাজকে। তারাও এর ভূত-ভবিষ্যৎ না ভেবে গলাধঃকরণ করে নিচ্ছে গোগ্রাসে। এর সাথে যোগ হয়েছে অশ্লীল ভারতীয় চলচ্চিত্রের রমরমা ব্যবসা। সাথে পর্নোগ্রাফি, ওয়েব সিজিসহ নানা ধরনের যৌন উত্তেজক ছবির ব্যবসা। অবাধ তথ্য-প্রযুক্তির সুযোগে পশ্চিমা বিশ্বের যত রকমের পাপ আমাদের মাঝে প্রবেশ করছে, ওরা ব্যবসা করছে আর তাদের ব্যবসায়ের পণ্য আমাদের তরুণরা।

৫. প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও সোস্যাল মিডিয়ার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারঃ
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের জীবন অনেকটাই ভার্চুয়াল হয়ে গেছে বলা চলে। দিনের শুরু থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত বাস্তব জগতের চাইতে ভার্চুয়াল জগতেই বিচরণটা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার সত্যিই পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু এতে কমেছে সম্পর্কের আন্তরিকতা, বেড়েছে দূরত্ব, অশ্লীলতা পৌঁছেছে তার চরম সীমায়, অপসংস্কৃতির সয়লাবে সমাজ ও সামাজিক ব্যবস্থা ভাঙনের মুখে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এসব বিষয় ক্রমশ‌ই জটিল আকার ধারণ করছে‌। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের এ যুগে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হচ্ছে সোস্যাল মিডিয়ায়, বিশেষ করে ফেইসবুকে। জানুয়ারি ২০২২ এর একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে বাংলাদেশে প্রায় ৪৪ মিলিয়ন ফেইসবুক ব্যবহারকারী রয়েছে যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ শতকরা ৫০ ভাগ ১৫-২৪ বছর বয়সী! বাকি ৫০ ভাগের মধ্যে প্রায় ২৫ ভাগ ২৫-৩৪ বছর বয়সী। অর্থাৎ মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৫ শতাংশ তরুণ বয়সীরাই সোস্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি বিচরণ করছে। বর্তমান সময়ে সবার হাতে হাতে স্মার্টফোন চলে আসায় সোস্যাল মিডিয়ায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিচরণ যুবসমাজের নৈতিক দিককে মারাত্মকভাবে দূর্বল করে দিয়েছে। অশ্লীল বিজ্ঞাপন, ফটো, ভিডিও ইত্যাদি ধীরে ধীরে তরুণ-যুবকদের নৈতিকতায় ফাটল ধরিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ফেইসবুকের অধিকাংশ ভিডিওতে এমনসব মিউজিক এবং দৃশ্য দেখানো হয়, যা একজন যুবককে হারাম রিলেশনশিপ, অশ্লীলতা ও শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজে সহজেই ধাবিত করে। এখন‌ই এর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যত প্রজন্ম ভয়াবাহ এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে।

৬. ওয়েব সিরিজঃ
প্রকাশ্য অশ্লীলতার সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করেছে সম্প্রতি গজিয়ে ওঠা ওয়েব সিরিজসমূহ। অশ্লীল বচন, যৌন সুড়সুড়িমূলক পোষাক ও অঙ্গভঙ্গিসহ যুবকদের অশ্লীলতার সাগরে ডুবিয়ে দেওয়ার সমস্ত আয়োজনই রয়েছে এসব ওয়েব সিরিজে। নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট ও অ্যাপ্লিকেশন ছাড়া দেখা না গেলেও ফেইসবুকে বিভিন্ন পেইজে ছোট ছোট ক্লিপের মাধ্যমে সহজেই এসবের প্রচার ও তরুণ-যুবকদের অশ্লীলতার দিকে ধাবিত করতে যথেষ্ঠ ভূমিকা পালন করছে ওয়েব সিরিজ নামক এই নোংরা প্লাটফর্ম।

৭. পর্নোগ্রাফিঃ
এটা যদিও নতুন কোনো বিষয় নয়, কিন্তু প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে খুব সহজেই যুবকদের হাতের নাগালে এসে যাচ্ছে চরিত্র ধ্বংসের সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান পর্নোগ্রাফি। বাংলাদেশ সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কয়েকশ’ পর্ন সাইট বন্ধ করা হলেও প্রযুক্তির এই যুগে যুবসমাজকে এখান থেকে ফেরানো সম্ভব হচ্ছে না। অন্য দেশের ভিপিএন ব্যবহার করে খুব সহজেই এসব পর্ন সাইট ভিজিট করছে আসক্তরা। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৮-১৬ বছর বয়সী ৯০ শতাংশ শিশু ও তরুণ পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। ১৮-৩৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এই সংখ্যা শতকরা ৭০ ভাগ। কী ভয়াবহ এক দৃশ্য! এর ফলাফলও খুব ভয়ানক। বর্তমানে সবচেয়ে সমালোচিত দুটো বিকৃত মানসিকতার সূচনা হয় এই পর্নোগ্রাফি থেকে। এর একটি হচ্ছে সমকামিতা ও অন্যটি ট্রান্সজেন্ডার। পর্ন আসক্তি থেকে এক পর্যায়ে সমকামিতার দিকেই ঝুঁকছে তরুণ-তরুণীরা। গবেষণায় দেখা গেছে এর অন্যতম কারণ পর্নোগ্রাফির ফলে যে ধরনের মানসিকতার তৈরি হয়, তা চরিতার্থ করাটা বাস্তবিকই অনেক কঠিন। তবে সমলিঙ্গের মানুষের সাথে মেলামেশাটা সহজ। এই মানসিকতা থেকেই এক পর্যায়ে সমকামিতার জন্ম নেয়। আর এর অন্যতম একটা ভয়াবহ ফলাফল চরম মানসিক বিকৃতি- ট্রান্সজেন্ডারবাদ। আল্লাহ তায়ালা এই নিকৃষ্ট গোনাহের কারণে হযরত লূত (আ)-এর জাতিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।

৮. সামাজ ও রাষ্ট্রের দায়হীনতাঃ
নৈতিক অবক্ষয়টাকে যেন সামাজিকভাবে অঘোষিত স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে! অবৈধ প্রেম, ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা, সামাজিক অনুষ্ঠানে যাচ্ছেতাই কার্যকলাপ, উচ্চস্বরে গানবাজনাসহ এই ধরনের ব্যাপারগুলো খুব স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজের কর্তারা এসব বিষয়ে এতোটাই উদাসীন যে, মনে হয় তারা এটাকে স্বীকৃতি দিয়ে দিয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা একেবারে শূণ্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্র চাইলে তার নাগরিকদের সৎপথে চালনা করতে পারে, অন্যায়কে দূর করতে পারে, সিস্টেম বা ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অন্যায় ও অপরাধকে দমন করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের কর্তারাই যদি হয় অসৎপ্রবণ, দূর্ণীতিপরায়ণ, নৈতিক শিক্ষার ব্যাপারে উদাসীন, তবে রাষ্ট্রের পরিণতি কেমন হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। বর্তমানে রাষ্ট্রের আচরণে এই চরিত্রই ফুটে উঠছে। নৈতিক অবক্ষয়ের ব্যাপারে রাষ্ট্রের যেন কোন দায়িত্বই নেই। কখন‌ও কখনও এমন‌ও দেখা যায় যে ভিনদেশীদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি আমদানি করে যুবসমাজের চরিত্র ধ্বংসের প্রকাশ্য মহড়ায় মেতেছে স্বয়ং রাষ্ট্রযন্ত্র! পেছন থেকে নয়, প্রকাশ্যে সামানে থেকেই পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে অনৈতিক কার্যকলাপে।

৯. পশ্চিমা বিশ্ব ও জায়োনিস্টদের চক্রান্তঃ
শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে তাদের চক্রান্ত চরম আকার ধারণ করেছে। পশ্চিমা ও ইউরোপীয় সভ্যতা নামক অসভ্যতার করাল গ্রাসে যুবসমাজ তাদের চরিত্রকে খুইয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর গোড়ায় রয়েছে ইয়াহুদী জায়োনিস্টদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। নাটক ও ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপন পর্যন্ত সংস্কৃতির আধুনিক সকল উপকরণ তাদের ষড়যন্ত্রের শক্তিশালী অস্ত্র। মঞ্চনাটকে অশ্লীলতা প্রদর্শন তারাই শুরু করে সর্বপ্রথম। তারাই আবার মঞ্চনাটক থেকে এগুলোকে ফিল্মে রূপদান করেছে। বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা চালু করা ও অশ্লীলতা প্রদর্শনের মাধ্যমে যুবসমাজের চরিত্র ধ্বংস করার সব আয়োজনই সম্পন্ন করেছে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে। আমেরিকার বিখ্যাত ফোর্ড মোটরগাড়ি কোম্পানির মালিক হেনরি ফোর্ড তার ‘সিক্রেটস অব জায়োনিজম’ গ্রন্থে এ ব্যাপারে বিস্তর আলোচনা করেছেন।

প্রতিকারের উপায়
১. পারিবারিক সচেতনতাঃ
পূর্বেই বলেছি পরিবার হচ্ছে সমাজের ক্ষুদ্রতম একক। নৈতিক শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এটি। তাই যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধে পারিবারিক সচতনতাই সবচেয়ে বেশি জরুরি। ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের ধর্মীয় ও নৈতিক বুনিয়াদি শিক্ষায় অভ্যস্ত করতে হবে। তাদেরকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। শুধু পড়াশোনার ওপর নির্ভর না করে মানুষের মতো মানুষ তৈরিতে শিষ্টাচার, সামাজিকতা, মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষাটা পরিবার থেকেই দিতে হবে। পাশাপাশি তাদের শিক্ষার ভিত্তি যেন হয় দ্বীন শিক্ষা। এই ব্যাপারে পবিত্র কুরআনের সূরা লুকমানে উল্লেখিত নিজ পুত্রকে দেওয়া হযরত লুকমান (আ) এর উপদেশগুলো বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। “হে আমার প্রিয় বৎস, নিশ্চয় তা (পাপ-পুণ্য) যদি সরিষা দানার পরিমাণ হয়, অতঃপর তা থাকে পাথরের মধ্যে কিংবা আসমানসমূহে বা যমীনের মধ্যে, আল্লাহ তাও নিয়ে আসবেন; নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞ। হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং তোমার উপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধর। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ। ” (সূরা লুকমানঃ ১৬-১৭)
তাই ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষাকে সমাজের ক্ষুদ্রতম একক পরিবার পর্যন্ত মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আলেমসমাজ ও সচেতন মহলকে ভূমিকা পালন করতে হবে।

২. শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার
সবকিছুর মূলে রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা। আফ্রিকার সবচেয়ে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়- ইউনিভার্সিটি অব সাউথ আফ্রিকার প্রবেশদ্বারে লেখা রয়েছে, “কোনো জাতিকে ধ্বংস করার জন্য পারমাণবিক হামলা কিংবা ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপের দরকার নেই। বরং সেই জাতির শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়াই যথেষ্ঠ। ” তাই যুবসমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে বাঁচাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শিক্ষার সংস্কার। শিক্ষাব্যবস্থাকে নৈতিকতার মানদন্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। আর তাই শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি হতে হবে ইসলাম। কেননা ইসলামই সর্বোত্তম নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। আকাবার প্রথম বাইয়াতে ৬ জন মদিনাবাসী ইসলাম গ্রহণের পর তাদের দ্বীন ও নৈতিকতা শেখানোর জন্য রাসূলুলুল্লাহ (স) হযরত মুস’আব ইবনে উমায়ের (রা) কে মদিনায় পাঠিয়েছিলেন। কেননা শিক্ষাই মানুষের নৈতিকতার ভিত্তি তৈরি করে।

৩. সহশিক্ষার পরিবর্তে ছেলে-মেয়ে আলাদা পাঠদানের ব্যবস্থা করা
সহশিক্ষা নৈতিক অবক্ষয়ের জন্য ভাইরাসের মতো কাজ করে। তাই নৈতিক অবক্ষয়রোধে সহশিক্ষা বন্ধ করা অতীব জরুরি। এর পরিবর্তে দুই শিফটে ছেলে-মেয়ে আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এই ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় ক্যাম্পাস আলাদা করে দিতে পারলে। যদিও তা সকল ক্ষেত্রে সম্ভব নয়, তবুও অন্ততপক্ষে আলাদা ক্লাসরুম অথবা আলদা শিফটের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

৪. দ্বীনি জ্ঞানার্জনের চর্চা বাড়ানো
একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি দ্বীনি জ্ঞানার্জনের চর্চা বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবার ও সামাজিকভাবে ভূমিকা পালন করা যেতে পারে। ইসলামী সংগঠগুলোর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্ব্বপূর্ণ। জনে জনে দাওয়াত ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুবসমাজের নৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করতে হবে। এক্ষেত্রে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির লক্ষ্যে গণপাঠাগার, মসজিদ পাঠাগার, রিক্সা পাঠাগার, রেস্টুরেন্ট পাঠাগার ইত্যাদি মাধ্যমে সমাজের সর্বত্র বইপাঠের একটি পরিবেশ তৈরি ও মোটিভেশন চালানো প্রয়োজন। পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাহিত্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে।

৫. সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ সাধন
সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। এই আধুনিক প্রযুক্তির যুগে শুধু ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে যুবসমাজকে সঠিক পথে রাখা কঠিন হবে। তাই ইসলামী ও সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চা বাড়াতে হবে। মানসম্মত কন্টেন্ট তৈরি করতে হবে। এই সেক্টরে দক্ষ জনশক্তিদের বিশেষ পরিকল্পনার আলোকে কাজে লাগাতে হবে।

৬. সোস্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার
সময়ের গুরুত্ব উপলিব্ধি করিয়ে সর্বপর্যায়ে সোস্যাল মিডিয়ার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে পাঠাভ্যাস বৃদ্ধি সোস্যাল মিডিয়ার বিপরীতে একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। মুমিনরা অনর্থক কাজে সময় নষ্ট করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা সফল মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, “আর যারা অনর্থক কথা-কাজ থেকে বিরত থাকে। ” (সূরা মু’মিনুনঃ ০৩)

৭. প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা
যথাযথ প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা যাবে অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তিও গড়ে উঠবে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

৮. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি
সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা বেশি জরুরি। বিভিন্ন শালীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক যোগাযোগের মাধ্যমে সাধারণ জনতা ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে সচতনতা সৃষ্টি করতে হবে।

৯. সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা
রাষ্ট্রকে নৈতিকতার ছাঁচে ঢেলে সাজাতে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি বরং সবজেয়ে বেশি জরুরি বললেও অত্যুক্তি হবে না। সমাজজীবনে ভাঙন ও বিপর্যয়ের মূল কারণ অসৎ নেতৃত্ব। তাই যুবসমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি একটি আদর্শ, ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়ার জন্য সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। সৎ ও খোদাভীরু নেতৃত্বই পারে একটি কল্যাণমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। আল্লাহ বলেন, “যদি আমি তাদের এই জমিনে কর্তৃত্ব দান করি, তাহলে তারা নামাজ কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, সৎ কাজের আদেশ দিবে, অন্যায় কাজে বাধা প্রদান করবে। ” (সূরা হাজ্জ- ৪১)
[প্রবন্ধটি মাসিক ছাত্রসংবাদ জুন ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত]

পঠিত : ৭৬ বার

মন্তব্য: ০