নারীদের মুখমণ্ডল খোলা রাখার বিধানসহ ইসলামে পর্দার বিধান
তারিখঃ ৬ জুন, ২০২৫, ১৯:৫৮
ভূমিকা:
আলহামদুলিল্লাহি নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলুহিল কারীম, আম্মাবাদ। আল্লাহপাকের অশেষ কৃপায় বিরতিসহ ২০০৪ সালের দ্বিতীয়ার্ধের থেকে কমবেশি লেখালেখি, দাওয়াতী দ্বীনের কাজে বক্তৃতা ও ইমামতি চলছে। সে সময় লেখালেখির শুরুতে বাইতুল মোকাররমের তৎকালীন খতিব মাওলানা ওবায়দুল হক, গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদের (আজাদ মসজিদ) তৎকালীন খতিব মাওলানা মাহমুদুল হক, ঢাকা উত্তর বাড্ডা কামিল মাদ্রাসার হেড মুহাদ্দিস মাওলানা আক্কাস আলী রশিদী সহ অনেক গুণীজনের সাথে সাক্ষাৎ করে লেখার বিষয়গুলো নিয়ে পরামর্শ করি। প্রথম লেখার বিষয় ছিল চাঁদপুরের তথাকথিত সুন্নি নামধারী বিদআতিদের বিরুদ্ধে "নবীর (সা

প্রতি শির্ক আকিদা বনান সঠিক আকিদা" নামে।
এভাবে করে অন্যান্য লেখার পাশাপাশি অনেকদিন থেকেই মনে মনে ভাবছিলাম পর্দার বিস্তারিত বিধান ব্যাখ্যাসহ কিন্তু অতি সংক্ষেপে দলিল ভিত্তিক একটি বই লিখব। অবশেষে সেই লেখার কাজে সময়ের ব্যস্ততা সত্ত্বেও কিছুটা সময় প্রচেষ্টা করছি এবং আল্লাহপাকের সহায় কামনা করছি।
হাদিসে বর্ণিত এ বিষয়ে অনেকেই অবগত আছেন যে, মারা যাবার পরও মুমিনের তিনটি নেক কাজ চলমান থাকে। তার একটি হলো উপকারী ইলম। তাই এই লেখা এবং প্রকাশের কাজে যে বা যারা আমার সাথে সহযোগিতা করেছে, করছে ও করবে আল্লাহ পাকের কাছে তাদের উত্তম জাযা কামনা করছি।
আমার এই দলিল আনয়ন এবং ব্যাখ্যা প্রদানে কারো সাথে দ্বিমত হলেও শ্রদ্ধার সাথে আমি উল্লেখ করতে চাই এবং আপনার দ্বিমত পোষণটাও আপনি সম্মানের সাথে তুলে ধরবেন তাতে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না। কোনো অংশ নিশ্চিত ভাবে ভুল প্রমাণিত হলে আমি শুধরে নেব ইনশাআল্লাহ।
ইসলাম মানবজীবনের সর্বস্তরের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইহা শুধু পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, রমজানের সিয়াম সহ আনুষ্ঠানিক ইবাদতের নাম নয়, বরং সমাজ, পারিবারিক জীবন, নৈতিকতা, লজ্জা-শরম এবং ব্যক্তিগত শালীনতারও পরিপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে। পর্দা (হিজাব) ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশাসন, যা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য, যদিও নারীর ক্ষেত্রে এর পরিধি তুলনামূলক বিস্তৃত।
---
প্রথম অধ্যায়
ইসলামে পর্দার গুরুত্ব, মূলনীতি ও প্রয়োজনীয়তা :
১. পর্দার মূলনীতি – কুরআনের নির্দেশনা
(ক) পুরুষদের দৃষ্টি সংযম ও লজ্জাশীলতা:
> قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ
“মুমিন পুরুষদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং নিজেদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে।”
– সূরা আন-নূর, আয়াত ৩০
ব্যাখ্যা (তাফসির ইবন কাসীর):
এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, দৃষ্টির সংযম ইসলামে ফরজ। কারণ দৃষ্টি পাপের প্রথম ধাপ। এখানে 'يغضوا' শব্দটি এসেছে ‘ঘাদ্দা’ থেকে, যার অর্থ দৃষ্টি নামিয়ে রাখা, বা চোখ হেফাজত করা। এটি নারী ও পুরুষের মধ্যে শালীনতা ও নিরাপত্তার প্রথম স্তম্ভ।
(খ) নারীদের জন্য দৃষ্টির সংযম ও পর্দার নির্দেশনা:
> وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ
“আর মুমিন নারীদের বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং নিজেদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে।”
– সূরা আন-নূর, আয়াত ৩১
এ আয়াতে নারীদের জন্য একইরূপে দৃষ্টি সংযম ও লজ্জাশীলতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এবং এরপর তাদের পোশাক-পরিচ্ছদের আদব সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা এসেছে (এ বিষয়ে পরবর্তী অধ্যায়ে বিস্তারে আলোচনা হবে)।
---
২. হাদিসের আলোকে পর্দার গুরুত্ব
(ক) লজ্জাশীলতা ঈমানের অংশ:
আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন:
“নিশ্চয় লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।”
– সহিহ বুখারী, হাদিস: ৯ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুবাদ)
(খ) চোখের ব্যভিচার এবং বাস্তবিক পর্দার প্রয়োজন:
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন:
“চোখ ব্যভিচার করে এবং তার ব্যভিচার হচ্ছে দৃষ্টি।”
– সহিহ বুখারী, হাদিস: ৬২৪৩ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুবাদ)
এ হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যে দৃষ্টির অপব্যবহারও ব্যভিচার হিসেবে গণ্য হয়। সুতরাং শারীরিক পর্দার আগে দৃষ্টির পর্দা অনিবার্য।
---
৩. সাহাবীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্দার বাস্তব প্রয়োগ
(ক) উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাঃ) এর বর্ণনা:
“আনসার নারীরা কত উত্তম! তারা যখন আল্লাহর এই আয়াত শুনলো:
‘তারা যেন নিজেদের ওড়না বক্ষদেশে ফেলে দেয়’ (সূরা আন-নূর: ৩১),
তখন তারা সাথে সাথে নিজেদের ওড়নাগুলো কেটে বক্ষ আচ্ছাদন করে নিল।”
– সহিহ বুখারী, হাদিস: ৪৭৫৮ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনুবাদ)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সাহাবীদের সময় নারীরা শরিয়তের নির্দেশ পেলে অবিলম্বে তা পালন করতেন, এবং পোশাক-পর্দা নিয়ে সচেতনতা ছিল অত্যন্ত দৃঢ়।
---
৪. ইসলামী ফিকহে পর্দার অবস্থান
ইমাম নববী (রহঃ) বলেন,
“লজ্জাশীলতা ও পর্দা ইমানের শাখা; এটি সমাজে শান্তি রক্ষার মাধ্যম।”
– শরহ সহিহ মুসলিম, ইমাম নববী
ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) থেকে শুরু করে সকল বিখ্যাত ফকীহগণ ‘পর্দা’কে ফরজ বিধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। যদিও মুখমণ্ডল ঢাকা ফরজ কি না, সে বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে – যা আমরা পরবর্তী অধ্যায়সমূহে বিস্তারিত আলোচনা করবো,ইনশাআল্লাহ।
পর্দা শুধুমাত্র পোশাক নয়, এটি একটি মনোভাব। একজন মুসলিমের চোখ, চিন্তা, ভাষা, আচরণ – সব কিছুতেই পর্দার ছোঁয়া থাকা চাই। কুরআন ও সহিহ হাদিসে পর্দা ও লজ্জাশীলতার প্রতি যত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা একে মৌলিক ইসলামী বিধানের স্তরে উন্নীত করেছে।
চলবে...........

মন্তব্য: ০