শিবির নির্মূল এবং উচ্ছেদ : সেকাল থেকে একাল
তারিখঃ ১০ জুন, ২০২৫, ০৮:১৭
অতি সম্প্রতি কোনো একজন বয়স্ক ছাত্রনেতা শিবির উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছেন। তার ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে কৌতুহল সৃষ্টি করেছে। ইত:পূর্বে অনেকেই শিবির নির্মূলের ঘোষণা দিয়ে নিজেরাই নির্মূল হয়ে গিয়েছেন। তাই পাঠকদের উদ্দেশে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে আজকের উপস্থাপনা :
১৯৭৭ থেকে ১৯৮১
১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্র শিবিরে প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ৪ বছর নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। ৭৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭৮ থেকে ৮০ সালের মধ্যে দেশের বড় বড় প্রায় ৫০ টি কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবির পূর্ণ প্যানেলে বিজয় অর্জন করে। কলেজগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : রংপুর কারমাইকেল কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ, খুলনা বি এল কলেজ, যশোর এম এম কলেজ, চট্টগ্রাম কলেজ, মহসিন কলেজ, কক্সবাজার সরকারী কলেজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারী কলেজ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ইত্যাদি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে কেন্দ্রীয় সংসদের সব কয়টি আসনে শিবিরের পূর্ণ প্যানেলে বিজয় আর্জন করে। একই বছর শিবির রাজধানীর রমনা গ্রীণে জাতীয় কর্মী সম্মেলন আয়োজন করে। সম্মেলনে মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন মালয়েশিয়ান যুব সংগঠন আবিমের সভাপতি আনোয়ার ইবরাহীম, সুদানের জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও সরকার প্রধান আহমদ তুতুনজীসহ পৃথিবীর নানা দেশের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতৃবৃন্দ যোগদান করেন। শিবিরের কর্মী সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত স্মরণিকায় শুভেচ্ছা বানী প্রদান করেন দেশের প্রতিথযশা শিক্ষাবিদ ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। সারাদেশের কলেজসমূহে শিবিরের অভাবনীয় সাফল্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে পূর্ণ প্যানেলে বিজয় অর্জন এবং জাতীয় কর্মী সম্মেলন অপরাপর রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে মারাত্মকভাবে অন্তর্জালা বৃদ্ধি করে। এরপর ফলাফল দেখা যায় পরবর্তী বছর হতে।
মিডিয়ার ভূমিকা
পরবর্তীকালে বলা যায় ২০২৪ সাল পর্যন্ত পুরো সময়টা জুড়ে মিডিয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে ছিল বাম ঘরানার লোকজন। বিশেষ করে গত শতাব্দীর আশি এবং নব্বইয়ের দশক এবং এই শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত দুই ডজনের বেশি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের মাধ্যমে মিডিয়া ছিল বাম ঘরানার লোকদের দখলে। সাপ্তাহিক বিচিত্রা, সূর্যেোদয় সাপ্তাহিক আনন্দ বার্তা, সাপ্তাহিক বিচিন্তা, সাপ্তাহিক সুগন্ধা, সাপ্তাহিক বর্তমান দিনকাল। এ সব সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের একটি মিশনি ও ভিশন ছিল ইসলামী সংগঠন ও ইসলামী আদর্শের যারা নেতৃত্ব দেয় তাদের চরিত্র হণন করা। গত শতকের শেষ তিন শতক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনগুলো দাপটের সাথে মিডিয়ায় রাজত্ব করেছে। বিচিত্রা ছিল ইসলামীপন্থীদের চরত্রি হননের মাস্টার মাইণ্ড। পরবর্তীতে শাফিক রেহমানের সম্পাদনায় সাপ্তাহিক যায় যায় দিন বাজারে আসায় বিচিত্রা তার সামনে টিকতে পারেনি। ঘাদানিক নেতা সাপ্তাহিক বিচিত্রার মাধ্যমে অনেক বড় বড় সাংবাদিক তৈরী করেছেন তবে সবাইকে গড়ে তুলেছেন ইসলাম বিদ্বেষী হিসেবে। সপ্তাহিক ম্যাগাজিনগুলোর বিলুপ্তির পর বাজারে আসে অনেকগুলো দৈনিক। দৈনিক বাংলাবাজার, আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, এই পত্রিকাগুলো এক সময় বাজার মাতায়। এরপর আসে জনকণ্ঠ। জনকণ্ঠের আধিপত্যের যুগ শেষ হবার পর বাজারে আসে প্রথম আলো যুগান্তর। সবগুলো মিডিয়াই শিবির বিরোধী নিউজ প্রকাশে বেশ আগ্রহী ছিল। এই পত্রিকাগুলোও শিবির নির্মূলে কম চেষ্টা করেনি। তাদের চেষ্টার বিপরীতে শিবির সামনে এগিয়েই যাচ্ছে। তারা নির্মূল হয়নি।
১৯৮২ থেকে ১৯৮৬
শিবিরের অভাবনীয় সাফল্য অপরাপর ছাত্র সংগঠনগুলো বিশেষ করে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর তীব্র আক্রমণ বৃদ্ধি পায়। তখন বাংলাদেশের অথিকাংশ কলেজে বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর দাপুটে অবস্থান ছিল। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র সমিতি ইত্যাদি সংগঠনগুলোর প্রায় সবগুলো কালেজ কমিটি ও কার্যক্রম ছিল। তখন ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, ও জাসদ ছাত্রলীগ মোটামুটি একটি শক্তি নিয়ে অবস্থান করতো। বাম সংগঠনগুলো তার অস্তিত্ব ও আদর্শিক মতাদর্শের কারণেই ছিল চরম ইসলাম বিদ্ধেষী। ইসলামী ছাত্রশিবিরের অগ্রযাত্রা তাদের শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলো। তারা সারাদেশে শিবির নিধনের ঘোষণা দেয়। শিবির নিধনের ঘোষণার সাথে সাথে তারা সারাদেশে যেখানে শিবিরের কর্মীদের দেখতে পেতো, মারধর করতো, ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিত। কলেজে ক্লাস করতে না দেয়া ইত্যাকার সব কার্যক্রম তারা জোরেশোরে শুরু করে। বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসী কার্যক্রম এমনভাবে বৃদ্ধি পায় যে সারাদেশে অনেক স্থানে শিবির কর্মীরা তাদের হাতে আহত থাকে। তাদের অসংখ্য নেতা কর্মীকে তারা এ সময়ে হত্যা করে। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসক এরশাদ বন্দুকের নলের জোরে ক্ষমতায় আসে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে বন্দুকের নলের জোরে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে সে ক্ষমতায় বসে। এরশাদ যেদিন ক্ষমতায় বসে তার পরের দিনই বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে শিবির সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে মিছিল বের করে। ক্ষমতা গ্রহণের পরদিন থেকেই এরশাদ ইসলামী ছাত্র শিবিরকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। এ কারণে তার শাসনকালের পুরো নয় বছর হত্যা সন্ত্রাস আর জালাও পোড়াও আন্দোলন করেও বামপন্থীরা পার পেয়ে গিয়েছে। তাদেরকে কোনো আইন আদালতের মুখোমুখি হতে হয়নি।
রাজশাহী বিশ্বিবদ্যালয়ে নির্মম হত্যাকাণ্ড
১৯৮২ সালের ১১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহারে ইসলামী ছাত্রশিবির আয়োজন করে নবীন বরণ অনুষ্ঠান। বাম ছাত্র সংগঠনগুলো নবীন বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন দেখে তারা একে বাঞ্চাল করার জন্য নানা ফন্দি আটতে থাকে। কোনো ষড়যন্ত্রই যখন নবীন বরণ অনুষ্ঠানকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি তখন বাম ছাত্র সংগঠন ছাত্র মৈত্রীর সশস্ত্র ক্যাডাররা নবীন বরণ অনুষ্ঠানে নারকীয় হামলা চালায়। তাদের হামলায় শিবিরের চারজন কর্মী নির্মমভবে শাহাদাত বরণ করেন এবং আহত হনে শতাধিক নেতা কর্মী। নিহতরা হলেন, সাব্বির, হামিদ, আইউব, জব্বার। ছাত্র মৈত্রীর সশস্ত্র ক্যাডাররা ইটের ওপর মাথা রেখে ইট দিয়ে থেতলে তাদেরকে হত্যা করে। ছাত্র মৈত্রীর এই নির্মম পৈশাচিকতায় গোটা দেশ বাকরুদ্ধ হয়ে যায় কিন্তু বাম সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসী কার্যক্রম থেকে থাকেনি এব মুহুর্তের জন্যও। এই নির্মম হত্যাকাÐের সব আসামীর বিরুদ্ধে আদালত ফাসির রায় দিলেও স্বৈর শাসক এরশাদ সব কয়টা খুনীকে ক্ষমা করে দেয় এমনকি কাউকে কাউকে সরকারী চাকুরী পর্যন্ত প্রদান করে।
১৯৮৭ থেকে ১৯৯০
হত্যা, গুম, খুন অপপ্রচার আর প্রপাগাণ্ডার মেশিন চালিয়েও যখন শিবিরের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করা যাচ্ছে না, তখন বাম ছাত্রসংগঠনগুলো মিলে গঠন করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তারা সারাদেশ শিবির নিধনের ঘোষণা দেয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সন্ত্রাসীরা সারাদেশে ব্যাপক তাণ্ডবলিলা চালাতে থাকে। শিবিরের অফিসে হামলা, অগ্নিসংযোগ, শিবির কর্মীদের একাকী পেলে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন এভাবে তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলতে থাকে। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর বছর ছিল ১৯৮৯ সাল। তখন এখনকার মতো সেলুলার ফোন ছিলো না। অনলাইন সিস্টেম ছিলো না। তখন সারাদেশে শিবিরে ওপর হামলার খবর নথিবদ্ধ করার জন্য একজনকে সারাক্ষণ টি এণ্ড টি ফোন সেটের সামনে বসে থাকতে হতো আর সারাদেশ থেকে খবর আসতো অমুক উপজেলায় অফিসে আগুন দিয়েছে জাসদ ছাত্রলীগ, অমুক মেসে হামলা করেছে ছাত্র ইউনিয়ন। এ রকম কার্যক্রমের মধ্যেই ১৯৯০ সালে এরশদা পতন আন্দোলন জোরাদার হয়। ৯০ সালের ০৬ ডিসেম্বর এরশাদের পতন হয়।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬
১৯৯০ সালের গণ অভূত্থানে স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর বিচার শাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বি এন পি আসন পায় ১৪০ টি, আওয়ামীলীগ ৮৭ টি, জাতীয় পার্টি ৩৫ টি, জামায়াতে ইসলামী ১৮টি। অন্যান্য দল যেমন কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, জাসদ, বাকশাল ২-৩টি করে আসন লাভ করে। জামায়াতে ইসলামী ১৯৯১ সালে মোট ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করলেও পরবর্তীতে ২১৪ আসনে দাড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে। নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর বিজয়ী আসন ছিল ১৮ টি তবে প্রাপ্ত ভোটের পারসেন্টেজ ছিল ১৩.৫%। ভোট প্রাপ্তির দিক দিয়ে তখন জামায়াতে ইসলামী ছিল তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। কোনো দলই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তখন দেশের বুদ্ধিজীবীগণসহ নানা মহল থেকে বিবৃতি দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি সমঝোতায় আসার আহ্বান জানায়, যাতে আর একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা কিংবা দেশে কোনো অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়। সেই সময় জামায়াতে ইসলামী কোনো শর্ত ছাড়াই বি এন পিকে সরকার গঠনে সমর্থন দেয়। বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিবিদ থেকে প্রধানমন্ত্রী হন। বি এন পি সরকারে আসার সাথে সাথে ছাত্রদল সারাদেশে রুদ্র মুর্তিতে হাজির হয়। ক্যাম্পাস দখল, খুন, রাহাজানি এবং সন্ত্রাসের এক রাম রাজত্ব তারা কায়েম করে। পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় এবং বড় বড় কলেজগুলোতে শিবিরের শক্ত সাংগঠনিক মজবুতি থাকায় তারা শিবিরকেই প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দাড় করায়। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ছাত্রদলের হাতে সারা দেশে শিবিরের ২৭ জন প্রতিভাবান নেতা শহীদ হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য খুলনা বি এল কলেজের জি এস মুন্সী আবদুল হালিম, এ জি এস আবুল কাশেম পাঠান, সাহিত্য সম্পাদক মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহ। চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের নির্বাচতি এ জি এস কাওসার আহমদ, রাজশাহী বিশ্বিবদ্যালয়ের আসলাম, আসগর প্রমূখ। একদিকে ছাত্রদলের সন্ত্রাস, খুন আর দখলদারিত্ব অপরদিকে মিডিয়ায় বামদের একক আধিপত্য থাকায় তাদের অব্যহত তথ্য সন্ত্রাসের কারণে সারাদেশে বাম গোষ্ঠী শিবির নিষিদ্ধের জন্য মিছিল ও দাবী দাওয়া পেশ করতে থাকে। তাদের দাবী দাওয়ায় হাওয়া দিতে থাকে বি এন পির কয়েকজন মন্ত্রী পর্যন্ত। ১৯৯১ থেকৈ ১৯৯৬ পর্যন্ত ছাত্রদলের কর্মসূচী ছিল শিবির নিধনের। ছাত্রদল আজ নেতৃত্ব খুজে পাচ্ছে না, তারাই এখনো সেই শ্লোগাণে রত আছে। সেই সময় যেই বাম সংগঠনগুলো শিবির নিষিদ্ধের দাবী তুলেছিল তাদের অস্তিত্ব আজ খুজে পাওয়া মুশকিল।
১৯৯৬ থেকে ২০০১
১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল আওয়ামীলীগ। এ সময় সারাদেশের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগ দখল, খুন, রাহাজানি এবং সন্ত্রাসের এক রাম রাজত্ব কায়েম করে। পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় এবং বড় বড় কলেজগুলোতে শিবিরের শক্ত সাংগঠনিক মজবুতি থাকায় তারা শিবিরকেই প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দাড় করায়। তারা শিবির নিষিদ্ধের দাবী জানায় বার বার। ছাত্রলীগের সন্ত্রাস আর নির্যাতন সহ্য করেই শিবির সারাদেশের ক্যাম্পাসে ইসলামী আদর্শের দাওয়াত অব্যগত রাখে।
২০০১ থেকে ২০০৬
২০০১ সালে চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসে। চারদলীয় জোটের অন্যতম শরীক ছিল জামায়াতে ইসলামী। এ সময় সারাদেশে শিবিরের ওপর অন্যান্য সংগঠনের হামলা, প্রপাগান্ডা অনেক কম ছিল। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের কার্যক্রমে বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ও বাম সংগঠনগুলো একাট্টা ছিল। এই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক পৃথক ঘটনায় মাঝে মাঝেই শিবিরের জনশক্তিদের শারিরীকভাবে নাজেহাল করা হতো। জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ একট্টা হয়ে শিবিরের জনশক্তিদের ওপর কয়েকবার আক্রমণ করে এবং শিবিরের অসংখ্য নেতা কর্মী আহত হয়।
২০০৮ থেকে ২০২৪
২০০৮ সালে একটি পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসে। তার ক্ষমতার মেয়াদে শিবিরকে নির্মূল ও নিশ্চিহ্ন করার জন্য এমন কোনো কার্যক্রম নেই যা তারা করেনি। একদিকে ফ্রাংকেনস্টাইন দানব ছাত্রলীগের তাণ্ডব অপরদিকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হামলা মামলা জুলুম নির্যাতন অব্যহত থাকে। শিবির পরিচয় পেলেই পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যেত। গ্রেফতারের পর মামলা এবং রিামান্ডের নামে চলতো নির্মম শারিরীক নির্যাতন। ক্যাম্পাসগুলোতে শিবিরের নেতা কর্মীদের জীবন হয়ে পড়ে বিপন্ন। শুধুমাত্র কাউকে শিবির বলে সন্দেহ হলেই তাকে নির্মম নির্যাতন করা হতো। বিশ^জিত এবং আবরার ফাহাদের ঘটনা তার জাজ্জল্যমাণ প্রমাণ। কারো টেবিলে কোনো ইসলামী বই পেলে এমনকি কোনো কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের টেবিলে কুরআন হাদীস পেলে পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়ে মিডিয়া ট্রায়াল করতো শিবিরের কর্মীদের কাছে জঙ্গী পাওয়া গিয়েছে। হাসিনার ফ্যাসিবাদী জামানায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মাধ্যমে মূলত শিবিরকে এক প্রকার নিষিদ্ধের মধ্যেই রেখেছিল তারা। সর্বশেষ হাসিনা পালিয়ে যাবার ৪ দিন আগে শিবিরকে আইনত নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু জালেমের পরিণতি খুব খারাপ হয়। শেখ হাসিনা পালিয়ে গিয়েছে কিন্তু শিবির এখনো আছে তার স্ব মহিমায়। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে কুরআনের আহ্বান পৌছে দিচ্ছে তরুণ ছাত্র সমাজের মাঝে। অতীতে অনেকেই শিবির নির্মূল করতে গিয়ে নিজেরাই নির্মূল হয়ে গিয়েছে। তাই বুড়ো বয়সে ছা্ত্র পরিচয় দেয়া যে নেতা শিবির নির্মূল অভিযানে নামতে চাচ্ছেন তার অন্তত আয়নায় নিজের চেহারাটা একবার দেখা দরকার
- মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান

মন্তব্য: ০