মল্লিক: একটি বিপ্লব, একটি নতুন ধারা
তারিখঃ ২৮ আগস্ট, ২০২৫, ২৩:৫৯
১.
ফিতা ক্যাসেটের যুগের শেষ সময়টার কথা। আমাদের বাড়িতে একটা টেপ রেকর্ডার ছিল। বেশ পুরোনো। ছিল অনেকগুলো ক্যাসেটের সংগ্রহও। এর মধ্যে বেশ কিছু ইসলামী সঙ্গীতের ক্যাসেটও ছিল। গান শোনা তখন নিত্যদিনের অভ্যাস।
যতটুকু মনে পড়ছে সে সময় সবচেয়ে বেশি যে গানগুলো শুনতাম—
• পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়
• টিক টিক টিক টিক যেই ঘড়িটা বাজে ঠিক ঠিক বাজে
• রাসুল আমার ভালোবাসা
• আম্মা বলেন ঘর ছেড়ে তুই যাসনে ছেলে আর
• যে কোনো কাজ করো না ভাই
• আয় কে যাবি সঙ্গে আমার
• এত শহীদ রক্ত ঢালে
• যা কিছু করতে চাও করতে পারো
• চলো চলো চলো মুজাহিদ
• সাহসের সাথে কিছু স্বপ্ন জড়াও
• একজন মুজাহিদ কখনও বসে থাকে না
• কোন সাহসে চাও নেভাতে অগ্নিগিরি বলো
• আমাকে যখন কেউ প্রশ্ন করে
তখন শুধু শুনতাম। কিন্তু এগুলোর গীতিকার বা সুরকার কে তা জানতাম না। গানগুলো এক ধরণের শিহরণ তৈরী করতো। Goosebumps হতো।
পরবর্তীতে জানতে পারলাম এ গানগুলোর গীতিকার শ্রদ্ধেয় কবি মতিউর রহমান মল্লিক। ততদিনে এই গানের পাখি তাঁর রবের সান্নিধ্যে চলে গিয়েছেন।
২.
স্কুলে থাকাকালীন একবার কিছু ভাইয়েরা ইসলামী সঙ্গীত প্রতিযোগীতার আয়োজন করেছিলো। অনেকটা শখের বশেই অংশগ্রহণ করেছিলাম সেই প্রতিযোগীতায়। কিছুদিন পর তাঁরা ফলাফল প্রকাশ এবং পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান করেছিল। কিন্তু অসুস্থতার কারণে যেতে পারি নি।
পরবর্তীতে একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সেই অনুষ্ঠানের অন্যতম আয়োজক জসীম ভাই আমাকে একটা প্যাকেট দেন। বেশ ভারীই ছিল। কৌতুহল বশত রাস্তাতেই প্যাকেটটি খুললাম। বেশ কিছু বই এবং স্টিকার ছিল। একটা স্টিকারে আমার চোখ আটকে গেল। সেটাতে লেখা ছিল —
❝ হঠাৎ করে জীবন দেয়া
খুবই সহজ
তুমি জান কী?
কিন্তু তিলে তিলে অসহ জ্বালা সয়ে খোদার পথে জীবন দেয়া
নয়তো সহজ
তুমি মানো কী? ❞
কথাগুলো আমার মধ্যে বেশ আলোড়ন তৈরী করেছিল।আমাকে বেশ ভাবিয়েছিলো। আসলেই তো!
রাস্তায় দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকবার পড়লাম লেখাটা। বাসায় এসে আমার পড়ার টেবিলের পাশে লাগিয়ে দিলাম স্টিকারটি। দীর্ঘ বারো বছর পর আজও সেই স্টিকারটি সেই জায়গাতেই আছে। অনেকবার উঠাতে চেয়েও মন সায় দেয় নি। সেই অমূল্য বাণীটি ছিল কবি মতিউর রহমান মল্লিকের।
৩.
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় হলের যে রুমটাতে থাকি, সেখানে আমার টেবিলের সামনে একটা ক্যালেন্ডার আছে। ক্যালেন্ডারটি আমার কাছে বিশেষ। কারণ ক্যালেন্ডারটিতে উল্লিখিত একটি গানের ৪ টি লাইন প্রতিনিয়ত আমার মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে, আন্দোলিত করে—
❝ আমরা জেগেছি, জাগাব এবার
শতকোটি তাজা প্রাণ
মিলিত ঐক্যে ভেঙেচুরে যাব
জুলুমের জিন্দান ❞
যখনই অলসতা ঘিরে ধরে, উদ্দমতা হারিয়ে ফেলি তখনই ক্যালেন্ডারটির দিকে তাকিয়ে এ চারটি লাইন বারবার পড়ি। নিজের মধ্যে নতুন করে শক্তি সঞ্চার হয়, কণ্টকাকীর্ণ পথও কেমন যেন মসৃণ মনে হয়।
এ চারটি লাইনের স্রষ্ঠাও কবি মল্লিক।
৪.
তিনি আমার মত হাজারো তরুণের স্বপ্নের নায়ক। তিনি চলে গিয়েও অমর। জাগরুক আছেন আমাদের মতো অগণিত তরুণের অন্তরে। এখনও জাগিয়ে যাচ্ছেন অসংখ্য শিশু-কিশোর, তরুণ-যুবক এমনকি বৃদ্ধদেরও।
তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন। তিনি একটি নতুন ধারা, তিনি একটি বিপ্লব। সেই বিপ্লব সাংস্কৃতিক বিপ্লব।
অপ-সংস্কৃতির বিপরীতে তিনি ইসলামী সাংস্কৃতিক বিপ্লব গড়ে তুলেছিলেন। তৈরী করে গেছেন অগণিত সাংস্কৃতিক বোদ্ধা।
তৈরী করে গেছেন তোফাজ্জল হোসাইন খাঁন, আতাউল গনী ওসমানী, আ.জ.ম ওবায়দুল্লাহ, চৌধুরী গোলাম মাওলা, আবু তাহের বেলাল, সাইফুল্লাহ মানছুর, মশিউর রহমান, আবুল আ'লা মাসুম, আব্দুস সালাম, নওশাদ মাহফুজ, বিলাল হোসাইন নূরী, মাহফুজ বিল্লাহ শাহী-সহ অসংখ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের। যাঁদের হাত ধরে আজ ৫৬ হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি জায়গায় ইসলামী সংস্কৃতির বিচরণ। তাঁরাও নিরলসভাবে তৈরী করে যাচ্ছেন এ অঙ্গনের উত্তরসুরী।
৫.
২০১০ সালের ১২ই আগষ্ট আমাদের প্রেরণার কবি, বিপ্লবের কবি, গানের পাখি আমাদের শৈশবেই এই দুনিয়ার মঞ্চ ছেড়ে যাত্রা করেন চিরন্তনের পথে। চলে যান তাঁর রবের কাছে। যাঁর গুনগান তিনি গানে গানে আমাদের শোনাতেন।
মহান রব তাঁকে ক্ষমা করুন, উত্তম বিনিময় দান করুন। জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন।
আমিন।

মন্তব্য: ০