Alapon

অর্থনীতি, ধর্মীয় রাজনীতি ও গোলাম আযম



অর্থনীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার ইসলামায়ন:

ইসলামি অর্থনৈতিক দর্শন ও ন্যায়বোধ

ইসলামি নৈতিক দর্শন অনুযায়ী সামাজিক-অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, আয়–সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা মৌলিক নীতি হিসেবে বিবেচিত। সুদ (রিবা) নিষিদ্ধকরণ এবং শরিয়াহ্‌ভিত্তিক আর্থিক কাঠামোর প্রবর্তন এ নীতিরই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ।

বাংলাদেশে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠার সূচনা

দলের পুনর্গঠন–পরবর্তী সময়ে গোলাম আযম ও জামায়াতের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডল ইসলামি অর্থনীতি বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ইসলামী ইকোনমিক্স রিসার্চ ব্যুরো (IERB) এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (IBBL)—এই দুই প্রতিষ্ঠান শরিয়াহ্‌সম্মত আর্থিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখে।

ইসলামী ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ

১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত IBBL আজ দেশের তৃতীয় বৃহত্তম এবং বেসরকারি খাতের সর্ববৃহৎ ব্যাংক।
এর বৈশিষ্ট্যসমূহ—

ক)৬৩.০৯% বিদেশি শেয়ারহোল্ডিং,

খ)৩১০টি শাখা,

গ)দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার প্রথম ইসলামি ব্যাংক,

ঘ)মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ১১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ।

ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে সৌদি রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আবদুল্লাহ আল-খাতিবের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল, যিনি গোলাম আযমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তাঁর উৎসাহে জামায়াতমুখী পেশাজীবী ও ইসলামমনস্ক বুদ্ধিজীবীরা ইসলামি আর্থিক কাঠামো বাস্তবায়নে অগ্রসর হন।

অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সম্প্রসারণ:
জাওয়াদ সাইয়েদ উল্লেখ করেন যে,জামায়াত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্বরা একাধিক ইসলামি ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া দল-সমর্থিত হাসপাতাল, ক্লিনিক, কোচিং সেন্টার ও এনজিও নিম্ন–মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সাশ্রয়ী সেবা প্রদান করে। উপসাগরীয় দেশসমূহ এবং পশ্চিমা প্রবাসী মুসলিম বাংলাদেশিদের অর্থায়ন এসব উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করেছে।

ধর্মনিরপেক্ষ অভিজাতদের দৃষ্টিতে গোলাম আযম:

১)যুদ্ধাপরাধ বিতর্ক ও সমালোচনামূলক অবস্থান

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বামপন্থী ও আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন করে। তাদের অবস্থান ছিল প্রতিশোধনির্ভর এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এই প্রেক্ষাপটে গোলাম আযমকে গণমাধ্যমে ১৯৭১ সালের সংঘটিত অপরাধের অন্যতম নায়ক বা ‘ঘাতক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

২)বিকল্প মূল্যায়ন: সামাদ ও তোহার দৃষ্টিভঙ্গি

অন্যদিকে, ইবনে গোলাম সামাদ ও কমিউনিস্ট নেতা মুহাম্মদ তোহা গোলাম আযমকে তুলনামূলকভাবে জটিল ও বহুমাত্রিক চরিত্র হিসেবে মূল্যায়ন করেন।

সামাদের মতে, গোলাম আযমকে দুটি ভিন্ন পাঠে দেখা যায়—

ক. গণমাধ্যমে প্রচলিত বর্ণনা: তিনি ১৯৭১ সালের গণহত্যার বেসামরিক পরিকল্পনাকারী।


খ.জনপরিসরের মূল্যায়ন: ২০১৪ সালে তাঁর জানাজায় লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণ তাঁকে ধর্মীয় ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

তাঁর ভাষ্যমতে, গোলাম আযম তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পর্ব— ব্রিটিশ যুগ, পাকিস্তানি যুগ ও স্বাধীন বাংলাদেশ— প্রত্যক্ষ করেছেন। বিশেষত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে ডাকসুর জিএস হিসেবে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।

মুহাম্মদ তোহা গোলাম আযমের ভদ্রতা, নৈতিক আচরণ ও নেতৃত্বগুণের প্রশংসা করেন এবং ভাষা আন্দোলনে তাঁদের যৌথ অংশগ্রহণের কথা স্মরণ করেন।

রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও নেতৃত্বের ধরণ:

সামাদ যুক্তি দেন যে গোলাম আযম উগ্র বা সহিংস মনোভাবাপন্ন ছিলেন না; বরং গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানোর পক্ষে ছিলেন। ক্ষমতা দখলের জন্য সহিংসতা, বোমা হামলা বা উগ্রবাদ তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অংশ নয়।

অধ্যাপক গোলাম আযমের রাজনৈতিক অবদান:

গোলাম আযম পাকিস্তান ও বাংলাদেশ— দুই প্রেক্ষাপটেই ইসলামি রাষ্ট্রকাঠামোর ধারণার পক্ষপাতী ছিলেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানসমূহ—

১)বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করলেও স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে শান্তি ও গণতন্ত্র রক্ষার প্রচেষ্টা,

২)১৯৮০-এর দশকে “কেয়ারটেকার সরকার” পদ্ধতির ধারণা প্রদান,

৩)২০০০-এর দশকে চারদলীয় জোটের রূপরেখা প্রণয়ন,

৪)ইসলামি সাহিত্য, বক্তৃতা ও শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে যুবসমাজে আদর্শিক প্রভাব বিস্তার।


সমসাময়িক মূল্যায়নে অধ্যাপক গোলাম আযমকে দ্বৈত আলোচনায় দেখা যায়—
একদিকে তিনি সমালোচকদের কাছে ১৯৭১-এর “ঘাতক”;
অন্যদিকে মৃত্যুর পর তাঁর জানাজায় ব্যাপক জনসমাগম তাঁকে জনগণের বৃহৎ অংশের কাছে আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

শেষ কথা
এই আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে বাংলাদেশের ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে জামায়াত ইসলামীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে অধ্যাপক গোলাম আযমের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে ঘিরে যে দ্বৈত আখ্যান—সমালোচনা ও শ্রদ্ধা—বাংলাদেশি জনপরিসরে বিদ্যমান, তা দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতার জটিলতাকে প্রতিফলিত করে।

সার্বিকভাবে, ইসলামি অর্থনীতির বিকাশ এবং অধ্যাপক গোলাম আযমের নেতৃত্বে জামায়াত ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

পঠিত : ১১৩ বার

মন্তব্য: ০